তীব্র সুগন্ধ ছড়ানো ফুলের প্রতি মানুষের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। হাসনাহেনা, কামিনী, জুঁই কিংবা বকুল—সুগন্ধের কারণে এসব ফুল অনেকেরই পছন্দ। তবে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, হাসনাহেনার গন্ধে নাকি সাপ আকৃষ্ট হয়। এমনকি অনেকে দাবি করেন, গাছের নিচে সাপকে বিশ্রাম নিতেও দেখা যায়। কিন্তু সত্যিই কি ফুলের গন্ধে সাপ আসে?
বিষয়টি আসলে তেমন নয়। সাপ ফুলের সুগন্ধে আকৃষ্ট হয় না। সাপের ঘ্রাণশক্তি থাকলেও মানুষের মতো করে তারা গন্ধ অনুভব করে না। গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সাপের জিহ্বা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাপকে প্রায়ই জিহ্বা বের করে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে নিতে দেখা যায়। এর মাধ্যমে তারা বাতাসে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক কণা সংগ্রহ করে। পরে জিহ্বার মাধ্যমে এসব কণা মুখের ভেতরের বিশেষ একটি অঙ্গে পৌঁছে যায়, যার নাম জ্যাকবসনস অর্গান বা ভোমেরোনাসাল অর্গান। এই অঙ্গ রাসায়নিক সংকেত বিশ্লেষণ করে সাপকে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, ফুলের সুগন্ধ, পচা কোনো কিছুর গন্ধ কিংবা শিকারের উপস্থিতি—সবই সাপের কাছে মূলত রাসায়নিক সংকেত। মানুষের মতো ‘সুগন্ধ’ বা ‘দুর্গন্ধ’ হিসেবে তারা এগুলোকে মূল্যায়ন করে না এবং ফুলের গন্ধের প্রতি আলাদা আকর্ষণও তৈরি হয় না।
এর পেছনে রয়েছে খাদ্য ও আশ্রয়ের সম্পর্ক। হাসনাহেনার মতো সুগন্ধি ফুল বাতাসে বিভিন্ন উদ্বায়ী যৌগ ছড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে রাতে ফোটা সুগন্ধি ফুল নানা ধরনের কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে। এসব কীটপতঙ্গ আবার কুনোব্যাঙ, মাকড়সা, টিকটিকি, গিরগিটি ও অন্যান্য ছোট শিকারি প্রাণীকে আকৃষ্ট করে।
আর এসব প্রাণীর মধ্যে কিছু সাপের খাদ্য।
ফলে ফুলের গন্ধে নয়, বরং ফুলের আশপাশে পাওয়া সম্ভাব্য শিকারের কারণে সাপ সেখানে আসতে পারে।
এ ছাড়া হাসনাহেনার মতো ঝোপালো গাছের গোড়ায় সাধারণত ছায়াময় ও তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ তৈরি হয়। খাবার খাওয়ার পর বা দিনের গরমে সাপ এমন জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে।
সাপ শীতল রক্তের প্রাণী হওয়ায় নিজের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। তাই ঘন গাছপালা, ঝোপঝাড় ও ছায়াযুক্ত স্থান তাদের জন্য বিশ্রামের উপযোগী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ড. ডেভিড জিসকের মতে, ফুলের সুগন্ধ সাপের মধ্যে কোনো বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে না। সাপ মূলত ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও উভচরের মতো শিকার অনুসরণ করেই ফুলগাছের আশপাশে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টক্সিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ব্রায়ান ফ্রাইও মনে করেন, সাপের ফুলের প্রতি কোনো প্রাকৃতিক আকর্ষণ নেই। হাসনাহেনার মতো ঝোপালো গাছের নিচের ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে ও ছায়াময় পরিবেশই তাদের সেখানে আশ্রয় নেওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
তাই ‘হাসনাহেনার গন্ধ পেলেই সাপ ছুটে আসে’—এটি মূলত প্রচলিত একটি ধারণা, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। কোনো হাসনাহেনা গাছের নিচে সাপ দেখা গেলে সেটির কারণ ফুলের গন্ধ না হয়ে সেখানে থাকা শিকার, নিরাপদ আশ্রয় কিংবা অনুকূল পরিবেশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
You cannot copy content of this page