দীর্ঘ টানাপোড়েন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই সমঝোতার আওতায় যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের জব্দ থাকা সম্পদের একটি অংশ ছাড়ের বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে।
তবে এটি কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়। বরং আগামী ৬০ দিনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলবে। আগামী শুক্রবার জেনেভায় চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে চলমান যুদ্ধবিরতি আরও দীর্ঘায়িত হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হবে। তবে লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা চুক্তির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পাকিস্তান জানিয়েছে, শুক্রবার জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে সমঝোতাটি কার্যকর হবে না। ফলে ততদিন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকবে।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করতে রাজি হয়েছে। এর বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণ করবে না। তবে ইরান দাবি করেছে, তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের ভেতরেই নিম্নমাত্রায় রূপান্তরের সুযোগ থাকতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য হবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সম্পূর্ণ অপসারণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
সমঝোতার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে ইসরাইলের অবস্থান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ঘোষণা দিয়েছেন, লেবাননে দখল করা এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ও জানিয়েছে, দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে ইসরাইল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে ইরান বারবার বলে আসছে, লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি টেকসই হবে না। ফলে এই ইস্যুটি আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইউরোপ, চীনসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। কয়েক মাসের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
তবে চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। লুক্সেমবার্গের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেভিয়ার বেটেল মন্তব্য করেছেন, ‘শুক্রবার আসতে এখনও অনেক দেরি।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
তবে পরে তিনি স্পষ্ট করেন, শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে না।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি গত কয়েক মাস ধরে কার্যত অচল থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বহু দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।
চুক্তির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি কমেছে।
বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড বিক্রি হচ্ছে ৮৩ দশমিক ৪০ ডলারে, যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি।
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদে ঝোঁক বৃদ্ধির কারণে স্বর্ণের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৩২২ দশমিক ৮৭ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে রূপা ও প্লাটিনামের দামও বেড়েছে।
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপের মুখে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে।
একই সঙ্গে রিপাবলিকান দলের একটি অংশ চাইছে, যেকোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের এই প্রাথমিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা তৈরি করলেও ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাত, পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনও বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে রয়ে গেছে। আগামী শুক্রবার জেনেভার বৈঠকই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির পথে এগোবে, নাকি নতুন করে সংকটের জন্ম দেবে।
You cannot copy content of this page