প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ১৪, ২০২৬, ২:১৯ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ১৩, ২০২৬, ৩:২৮ এ.এম
রাজশাহীতে কার্পজাতীয় মাছ চাষে উৎপাদনের নতুন দিগন্ত, প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার মাছ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়
রাজশাহী বিভাগে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে মাছ চাষিদের সংখ্যা। বর্তমানে বিভাগের আটটি জেলায় বছরে প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে প্রতিদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের মোট ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি পুকুরে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬ জন মাছচাষি মাছ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদিত মাছের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। পাশাপাশি কিছু প্রজাতির মাছ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত ৫০০টিরও বেশি ট্রাকে তাজা মাছ দেশের অন্তত ২৫টি জেলায় পাঠানো হয়। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাছ পরিবহন করা হয়। এতে প্রতিদিন ২০ কোটির টাকারও বেশি মাছের বাণিজ্য হয়।
বাড়ছে মাছ চাষে আগ্রহ
ফসল চাষে লোকসান ও মাছ চাষে তুলনামূলক বেশি লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন এখন মাছ উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৫০ ট্রাক মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
প্রযুক্তির ব্যবহারে সহজ হয়েছে পরিবহন
পারিলা গ্রামের মাছচাষি মোশারফ হোসেন জানান, একসময় জীবিত মাছ পরিবহনে অনেক কষ্ট হতো। বর্তমানে পানিভর্তি ট্রাকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে অক্সিজেন ও পানির প্রবাহ বজায় রেখে মাছ সহজেই জীবিত অবস্থায় বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এতে মাছের মান ভালো থাকে এবং বাজারদরও বেশি পাওয়া যায়।
ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে বড় সাফল্য
দুর্গাপুর উপজেলার মাছচাষি গোলাম সাকলাইন ১৯৯৪ সালে মাত্র দুই বিঘা জমিতে ৭ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্রায় এক হাজার বিঘা জলাশয়ে মাছ চাষ করছেন এবং তার প্রতিষ্ঠানে ১৫২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন তার খামার থেকেই প্রায় ২০টি ট্রাকে মাছ রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
প্রশিক্ষণ ও রপ্তানির সুযোগ
রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, বর্তমানে শুধু রুই-কাতলা নয়, পাবদা, শিং, কই, মাগুরসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছও বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে পাবদা মাছ নিয়মিত ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে। তিনি জানান, মাছ চাষের আধুনিক পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে প্রতিবছর দেড় হাজারের বেশি চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।
তবে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও
মাছচাষিরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মাছের খাদ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সেই তুলনায় মাছের বাজারমূল্য না বাড়ায় লাভের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এ অবস্থায় তারা আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের মতো নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সম্প্রসারণের ফলে রাজশাহী বিভাগ দেশের মিঠাপানির কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।