দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ বিতরণ এবং আদায়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও একই সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের (অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উইং) প্রকাশিত ‘কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির মাসিক প্রতিবেদন’-এ উঠে এসেছে এমন চিত্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) কৃষি ঋণ বিতরণ ও আদায়—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে কৃষি ঋণের বকেয়া বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে ১২৩.০১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ এবং প্রকৃত বিতরণের তুলনায় ৪.৪৮ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য ১০ হাজার ২২৩ কোটি টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ৩ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
গত এপ্রিল মাসে তফসিলি ব্যাংকগুলো মোট ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে। এটি আগের মাসের তুলনায় ২১.৯১ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলের তুলনায় ১৭.৪০ শতাংশ বেশি।
অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট কৃষি ঋণ বিতরণ হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২২.৪৩ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষি ঋণের বড় অংশ যাচ্ছে উৎপাদনশীল খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষকদের মতে, এতে বোঝা যায় কৃষি ঋণ এখন মূল উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ব্যাংকগুলো ৪ হাজার ৩১১ কোটি টাকার কৃষি ঋণ আদায় করেছে। এটি আগের মাসের তুলনায় ১০.৫৩ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮.২১ শতাংশ বেশি।
জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট ঋণ আদায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.৭৯ শতাংশ বেশি।
বিশেষ করে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় ১২৫.৬৪ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আদায় প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঋণ বিতরণ ও আদায়ের ইতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো খেলাপি ঋণ।
এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতে কৃষি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বকেয়া বা খেলাপি ঋণ ২২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
এক বছর আগে, ২০২৫ সালের এপ্রিল শেষে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৯ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২৩.০১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়াই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। এছাড়া ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালারও প্রভাব রয়েছে।
ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি), বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) গ্রামীণ অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত এপ্রিল মাসে পিকেএসএফ তার ২৮৯টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৫.১০ শতাংশ বেশি।
এদিকে গ্রামীণ ব্যাংক ও দেশের শীর্ষ ১০টি এনজিও এপ্রিল মাসে সম্মিলিতভাবে ১৮ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে। বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহক এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পাচ্ছেন।
ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকা, যার মধ্যে বকেয়া রয়েছে ৮ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৬.৫৮ শতাংশ।
ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আর্থিক খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অনেক কৃষকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। তাই কৃষি ঋণের তদারকি আরও জোরদার করার পাশাপাশি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে কৃষি খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
You cannot copy content of this page