প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে জমাটবাঁধা বরফ গলতে শুরু করেছে বলে মনে করছে দুই দেশ। আগামী মাসে বিমসটেক সম্মেলনের আগেই চলতি মাসের ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য এই সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র সময়ের আলোকে জানিয়েছে, আগামী ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে দিল্লি। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য সফরসূচি, বৈঠকের বিষয়বস্তু এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাব্য ইস্যুগুলো নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ চলছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জানা গেছে, ২১ থেকে ২৩ আগস্টের মধ্যে দুই দিনের যেকোনো সময়ে সফরটি হতে পারে। তবে দুই দেশের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য সময়সূচি হিসেবেই এটি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের পর সরকারের উচ্চপর্যায়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলে আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করতে পারেন। সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গেও বৈঠক হতে পারে।
এসব বৈঠকে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং শহিদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২৭ বা ২৮ আগস্ট জাতিসংঘ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারত সফরে যোগ দিতে পারেন।
এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের সফরকে দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে উভয় পক্ষই আগ্রহী। তবে সাম্প্রতিক অতীতের বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে অবস্থান করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
সম্পর্ক উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়ে ভারত সরকার দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠানোর পরও পরিস্থিতিতে নানা জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ সরকার।
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনা যাতে দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারেন, সে বিষয়ে আগেই ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপরও তাকে দিল্লি থেকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এসব ঘটনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে আমন্ত্রণ জানানোর ভাষা ও পদ্ধতি নিয়েও টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফলে ব্রিকসের আয়োজনে তার অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
এর মধ্যে গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এর আগের দিন, ৯ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যু, সম্পর্কের স্থবিরতা কাটানোর উপায় এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ভারতকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর দিল্লি সফরে যান দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে বৈঠক করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন, ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের অপেক্ষায় আছেন।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর দীনেশ ত্রিবেদীর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকটি সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়ে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবেশী দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরের জন্য নীরবে হলেও প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাব্য এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সফরে সীমাবদ্ধ না থেকে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করার ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। অতীতকে পেছনে ফেলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে একটি ‘ফ্রেশ স্টার্ট’ বা নতুন সূচনা প্রয়োজন।
You cannot copy content of this page