২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিলাই। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এবারের শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করে। কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেন, গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে পিলাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নাভি পিলাইয়ের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত তামিল পরিবারের সন্তান তিনি। বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠা পিলাই পরবর্তী সময়ে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক বন্দি ও অধিকারকর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশটির হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েন।
নাভি পিলাইয়ের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ১৯৯৪ সালের গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে তিনি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতি তদন্তে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন পিলাই। এ ছাড়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নোবেল কমিটির মূল্যায়নে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলমান থাকার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নাভি পিলাইকে পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরেছে নোবেল কমিটি।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। দিনটি নোবেল পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী।
এর আগে ২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো এবং ২০২৪ সালে জাপানের পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংগঠন নিহন হিদানকিও নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিল।
নাভি পিলাইয়ের এ অর্জন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সংঘাত বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; অপরাধের বিচার, ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
You cannot copy content of this page