দেখতে দেখতে ছয় মাস পূর্ণ করেছে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। সোমবার (১৭ আগস্ট ২০২৬) সরকার পরিচালনার ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিপুল জনসমর্থন ও ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও সমমনা জোট।
দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে অর্থনীতি ছিল অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চাপ ছিল। আগের সরকারের সময় ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনর্গঠন করে স্বাভাবিক ধারায় ফেরানো ছিল নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সরকারের দাবি, গত ছয় মাসে অর্থনীতি পুনর্গঠন, জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতি-নির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত স্বল্পমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক করতে কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রম আধুনিকায়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা যাতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার না হন, সে জন্য আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সরকারের দাবি, ব্যবসাবান্ধব নীতি, বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশে আস্থা ফিরেছে।
গত ছয় মাসে নেট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪টি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি পাটকল পুনরায় উৎপাদনে গেছে বলে সরকারের দাবি।
চীন, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কৃষি খাতেও একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের জন্য প্রায় ১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন টাকা বা ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সার, বীজ ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে সরাসরি ভর্তুকির অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা বাড়াতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। সরকারের দাবি, এর ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শহীদ পরিবারের জন্য ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৮ জন আহত জুলাই যোদ্ধার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১৩ হাজার ৪৭৯ জনকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নিয়মিত মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সরকারের।
এ ছাড়া গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৬৩ কোটি টাকা। প্রায় ৩ হাজার আহত যোদ্ধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণও চলমান রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৮০ শতাংশ নারী কর্মী নিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে।
কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলা হাসপাতালের শয্যা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কাজও চলছে।
স্বাস্থ্য খাতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় সংসদকে আরও কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫২টি সংসদীয় কার্যদিবসে ১০৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত এবং আরও জবাবদিহিমূলক করতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের গুম, খুন, ব্যাংক লুট, অর্থপাচারসহ আলোচিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনসহ আলোচিত হত্যা ও ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অর্থপাচার ও ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া, মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় নিম্নআয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ন্যায্যমূল্যে সরবরাহের লক্ষ্যে কিউআর কোড-সম্বলিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের মাসিক সম্মানী ভাতা বাড়ানো হয়েছে।
ছয় মাস পূর্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে আত্মমূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাস ছিল পূর্ববর্তী সময়ের প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায়। আগামী ছয় মাসে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, অধ্যাপক গোলাম হাফিজ সরকারের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা এবং বিপুলসংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে একদিকে যেমন বিভিন্ন সাফল্যের দাবি সামনে এসেছে, অন্যদিকে এসব উদ্যোগ বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয়।
You cannot copy content of this page