টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে গত সাত দিনে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যায় ১০ উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত পানিতে ডুবে এবং পাহাড়ধসে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে ১২ বছর বয়সী হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই বছরের শিশু মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে পানিতে ভেসে মারা যায় তিন বছর বয়সী শিশু পুষ্প। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে বসতঘর চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় এ পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জনই রোহিঙ্গা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। এছাড়া সদর উপজেলা, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ এলাকাও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাতামুহুরীর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া দুর্গতদের শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসাবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। তাদের মধ্যে ১৪ হাজার ৬১ জন ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
তিনি আরও জানান, দুর্গত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ বহাল রাখা হয়েছে।
You cannot copy content of this page