সংক্ষিপ্ত সুরাগুলোর মধ্যে সুরা কুরাইশ এমন এক অনন্য আবেদন সৃষ্টি করে, যা মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। অল্প কয়েকটি আয়াত হলেও এর বার্তা মানুষের মনে কৃতজ্ঞতা, আত্মসচেতনতা ও আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অতএব, তারা ইবাদত করুক এই গৃহের মালিকের, যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন।’ (সুরা কুরাইশ: ৩-৪)
এই আয়াত দুটি মহান নেয়ামতের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে—ক্ষুধার পর খাদ্য এবং ভয়ের পর নিরাপত্তা। নিঃসন্দেহে সম্মানজনক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই দুই নেয়ামত।
ক্ষুধার সময় খাদ্য শুধু আহার নয়, এটি জীবন ধারণের উপকরণ। এক টুকরো রুটি শরীরকে শক্তি দেয়, এক ফোঁটা পানি প্রাণকে সজীব করে এবং প্রয়োজনের সময় সামান্য খাবারও মানুষের কাছে অমূল্য হয়ে ওঠে। মানুষ যখন খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তখন শুধু তার পেটই ক্ষুধার্ত থাকে না; তার জীবনযাপন, মর্যাদা ও মানবিক অস্তিত্বও সংকটের মুখে পড়ে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা এমন এক নেয়ামত, যা মানুষের পুরো জীবনকে প্রশান্তিতে আচ্ছাদিত করে। রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো, সকালে উদ্বেগহীনভাবে জেগে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয়ের মধ্যে না থাকা—এসবই নিরাপত্তার অংশ।
মানুষ সাধারণত নিরাপত্তার মূল্য তখনই গভীরভাবে উপলব্ধি করে, যখন তা হারিয়ে যায়। কোনো সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়লে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। ঘুম হারিয়ে যায়, স্বস্তি নষ্ট হয় এবং প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগের মধ্যে কাটে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে এই নেয়ামতগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে সকালে জেগে দেখে সে তার ঘরে নিরাপদ, দেহে সুস্থ এবং তার কাছে দিনের খাবার আছে, সে যেন পুরো দুনিয়াই পেয়ে গেছে।’ (তিরমিজি: ২৩৪৬)
নিরাপত্তা, সুস্থতা ও প্রয়োজনীয় খাদ্য—এই তিনটি নেয়ামত একসঙ্গে থাকলে একজন মানুষ প্রকৃত অর্থেই অনেক বড় সম্পদের অধিকারী। তখন অন্যের কাছে থাকা সম্পদের দিকে তাকিয়ে আফসোস করার প্রয়োজন থাকে না।
এ কারণেই আল্লাহতায়ালা সুরা কুরাইশে কুরাইশ জাতিকে তাঁর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের ক্ষুধার পর খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপদ করেছেন। এসব নেয়ামত তাদের নিজস্ব শক্তি কিংবা পরিকল্পনার ফল নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ।
তাই নেয়ামতের প্রকৃত শোকর শুধু মুখে কিছু কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হৃদয়ে আল্লাহর অনুগ্রহের স্বীকৃতি, মুখে তাঁর প্রশংসা এবং কাজের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য—সবকিছুর সমন্বয়েই পূর্ণ হয় শোকর।
শোকরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আল্লাহ যে নেয়ামত দিয়েছেন, তা তাঁর অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার না করা। পাশাপাশি সেই নেয়ামতের স্থায়িত্বের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং নেয়ামতে নিমজ্জিত হয়ে তাঁর কথা ভুলে না যাওয়া।
যে ব্যক্তি ক্ষুধার পর খাদ্য এবং ভয়ের পর নিরাপত্তার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারে, সে খাদ্যহীন মানুষের কষ্টও অনুভব করে এবং নিরাপত্তাহীন মানুষের দুর্দশায় ব্যথিত হয়। এখানেই কৃতজ্ঞতার প্রকৃত সৌন্দর্য।
এই শিক্ষা আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের বর্তমান দুর্দশার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। খাদ্যের সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের জীবন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্ষুধা ও বঞ্চনার কারণে বহু মানুষ ন্যূনতম জীবনধারণের উপকরণ থেকেও বঞ্চিত।
এই পরিস্থিতিতে যেসব মানুষ বিশ্বস্ত ও অনুমোদিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মানবিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ১)
ফিলিস্তিন ও আল-আকসার প্রতি মুসলিম উম্মাহর গভীর আবেগ ও দায়িত্ববোধ রয়েছে। তাই তাদের দুর্দশার কথা স্মরণ করা, তাদের জন্য দোয়া করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী বৈধ ও বিশ্বস্ত মানবিক সহায়তায় অংশ নেওয়া আমাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ হতে পারে।
দোয়ার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। আন্তরিক নিয়ত ও ছোট একটি ভালো কাজও আল্লাহর কাছে মূল্যবান। কেউ সাহায্য করতে পারে, কেউ মানুষের কাছে তাদের দুর্দশার কথা পৌঁছে দিতে পারে, আবার কেউ শুধু আন্তরিকভাবে তাদের জন্য দোয়া করতে পারে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো কাছেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে, আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা: ১৮৬)
তুমি যদি গভীর রাতে একটি আন্তরিক দোয়া ছাড়া আর কিছুই করতে না পারো, তবুও দোয়া করো। যেমন তুমি চাও সংকটের সময়ে তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য কেউ দোয়া করুক, তেমনি অসহায় মানুষের জন্যও দোয়া করো।
হে আল্লাহ, তুমি ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষের সহায় হও। তারা ক্ষুধার্ত—তুমি তাদের আহার দাও; তারা ভীত—তুমি তাদের নিরাপত্তা দাও; তারা দুর্বল—তুমি তাদের শক্তি দাও। তাদের কষ্ট দূর করো, তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করো এবং তাদের জীবনে শান্তি ও প্রশান্তি ফিরিয়ে দাও।
হে আল্লাহ, তাদের ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগাও, মৃতদের প্রতি রহম করো, অসুস্থদের সুস্থতা দাও এবং নিখোঁজদের তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দাও। তাদের ওপর তোমার বিশেষ রহমত বর্ষণ করো। হে পরম দয়ালু, তুমি তাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও। আমিন।
You cannot copy content of this page