প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা টর্নেডো—এসব মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বজগতের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ মহান আল্লাহর হাতে। তাঁর ইচ্ছা ও নির্দেশ ছাড়া কোনো ঘটনাই ঘটে না। তাই দুর্যোগের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি বেশি বেশি মনোযোগী হওয়া, তওবা করা এবং তাঁর রহমত কামনা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "স্থলে ও জলে বিপর্যয় মানুষের কৃতকর্মের কারণে প্রকাশ পেয়েছে।" (সুরা রুম: ৪১)
ইসলামে দুর্যোগকে মানুষের জন্য এক ধরনের পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
"আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।"
(সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭)
অন্য আয়াতে এসেছে,
"তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কর্মফল। তবে তিনি অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।"
(সুরা শুরা: ৩০)
এসব আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, বিপদে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা, নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
ইসলামে যেকোনো দুর্যোগ বা বিপদের সময় বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ, তওবা-ইস্তিগফার এবং দোয়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করাও ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন, যেন আল্লাহ সমগ্র উম্মতকে একসঙ্গে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে ধ্বংস না করেন। দুর্যোগের সময় তিনি নিজেও বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করতেন এবং সাহাবিদেরও তা করতে উৎসাহিত করতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আকাশে মেঘ দেখা দিলে সাধারণ মানুষ যেখানে বৃষ্টির আশায় আনন্দিত হতো, সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। কারণ তিনি আশঙ্কা করতেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো শাস্তি হয়ে আসছে কি না।
তিনি বলেন,
"আমি আশঙ্কা করি, এটি আমার উম্মতের জন্য আজাব হয়ে আসে কি না। পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ওপর এভাবেই শাস্তি নেমে এসেছিল।"
(সহিহ মুসলিম: ৮৯৯, জামে তিরমিজি: ৩৪৪৯)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঝড়ো বাতাস বা দমকা হাওয়া শুরু হলে রাসুল (সা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। সাহাবায়ে কেরামও বিপদের সময় নামাজ আদায় করতেন, ধৈর্য ধারণ করতেন এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন। (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫৩৪৫)
ঝড়-তুফানের সময় তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলা এবং আজান দেওয়ার কথাও ইসলামী ফিকহে উল্লেখ রয়েছে।
ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টির সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দোয়া পাঠ করতেন—
اللهم إني أسألك خيرها وخير ما فيها وخير ما أرسلت به، وأعوذ بك من شرها وشر ما فيها وشر ما أرسلت به
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা ফিহা ওয়া খাইরা মা উরসিলাত বিহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা ফিহা ওয়া শাররি মা উরসিলাত বিহি।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমি এ বাতাস ও বৃষ্টির কল্যাণ, এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ এবং এর মাধ্যমে প্রেরিত কল্যাণ আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। আর এর অকল্যাণ, এর মধ্যে থাকা অকল্যাণ এবং এর মাধ্যমে প্রেরিত অকল্যাণ থেকে আপনার আশ্রয় চাই।
(সহিহ বোখারি: ৩২০৬)
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং মহান আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার ও দোয়া করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন মুসলিমের জন্য এ সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর রহমত কামনা করাই সর্বোত্তম করণীয়।
You cannot copy content of this page