প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরন। ভিপিএন, টর ব্রাউজার, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ভার্চুয়াল নম্বর, ভুয়া এনআইডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপফেক ও ডার্ক ওয়েবের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রযুক্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের শনাক্ত করা ও বিচারের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে অপরাধীরা যেভাবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেই তুলনায় বর্তমান সক্ষমতা এখনও পর্যাপ্ত নয়। সীমিত জনবল ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিয়ে পুলিশ সাইবার অপরাধ দমনে কাজ চালিয়ে গেলেও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
এক সময় পুলিশের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড। এখন অপরাধের বড় অংশই ঘটছে অনলাইনে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে বসেই পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানবপাচার এবং বিভিন্ন ধরনের সাইবার জালিয়াতি।
এই বাস্তবতায় পুলিশ তাদের সেবাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। বর্তমানে অনলাইন জিডি, ডিজিটাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, সিসিটিভি বিশ্লেষণ, সাইবার অপরাধ তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তথ্যভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম, সিসিটিভি মনিটরিং, জিপিএস ট্র্যাকিং ও আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এআইভিত্তিক রোড ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম, হ্যালো ডিএমপি অ্যাপ, অনলাইন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, লিভ ম্যানেজমেন্ট, ট্রাফিক ডিউটি ব্যবস্থাপনা এবং কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন সফটওয়্যারসহ একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। গত ২৯ এপ্রিল আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির একদিনে নয়টি নতুন অ্যাপ ও সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেন।
অপরাধ তদন্তেও প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস থেকে মুছে ফেলা তথ্য ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে উদ্ধার করা যাচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আঙুলের ছাপ, ডিএনএসহ বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের সুবিধা এখন আগের তুলনায় অনেক উন্নত। সিআইডি ও র্যাবের ফরেনসিক ল্যাব এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং ও ফরেনসিক ল্যাব এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সন্দেহভাজনের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেও তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পরও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ডার্ক ওয়েবে নজরদারি, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ থেকে তথ্য সংগ্রহ, উন্নত অনলাইন প্যাট্রোলিং এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ডার্ক ওয়েবে পরিচালিত কার্যক্রমে সরাসরি নজরদারির সক্ষমতা এখনও গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়।
সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান রেজা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও অপরাধীরা আরও দ্রুত প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। তারা ভিপিএন, টর ব্রাউজার, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং, ভার্চুয়াল নম্বর, ভুয়া এনআইডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি, এআই-নির্ভর ভয়েস ও ভিডিও, ডিপফেক, ফিশিং কিট, রিমোট অ্যাকসেস টুল এবং ডার্ক ওয়েব মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে তদন্তকে জটিল করে তুলছে।
তার মতে, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক ফরেনসিক সরঞ্জাম, উন্নত ল্যাব সুবিধা, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের দ্রুত ব্যবস্থা এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ঘাটতি এখনও রয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী কয়েক বছরে এআইভিত্তিক প্রতারণা, ডিপফেক ব্ল্যাকমেইল, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, র্যানসমওয়্যার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সাইবার আক্রমণ এবং ডার্ক ওয়েবভিত্তিক তথ্য কেনাবেচা আরও বাড়তে পারে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সাইবার সেন্টার, কাউন্টার টেররিজম প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, ট্যাকটিক্যাল প্রোটেকশন স্কুল, পুলিশ ইনোভেশন সেন্টার এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, অনলাইনভিত্তিক অপরাধীরা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে অপরাধ পরিচালনা করতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা এখনও অর্জিত না হলেও সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়ে সিআইডি নিরলসভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা হচ্ছে। তিনি জানান, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্তে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।
You cannot copy content of this page