কার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন কিংবা কথা বলার সময় কোন এলাকায় ছিলেন—এমন ব্যক্তিগত তথ্যও অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে বলে উঠে এসেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু এক-দুই দিনের তথ্য নয়, তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত পুরোনো তথ্যও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহের দাবি করছেন বিক্রেতারা। এসব তথ্য পেতে ক্রেতাদের কখনও কয়েকশ, আবার কখনও কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।
ডিসমিসল্যাব বলছে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায়ের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে।
শুধু কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) নয়, এই বাজারে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানো এসএমএসের তালিকা, নির্দিষ্ট সময়ে মোবাইল নম্বরের অবস্থান, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) এবং মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাবের বিবরণও বিক্রি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে এসব তথ্যের মূল্যতালিকাও পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে শুধু একটি মোবাইল নম্বর বা এনআইডি নম্বর চাওয়া হচ্ছে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করে তা সরকারি নথি বা সরকারি সংস্থার সার্ভার থেকে নেওয়া কপি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিসমিসল্যাব জানায়, ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত এক মাসে ফেসবুকে একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালিয়ে ৬৭৫টি পোস্ট পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬০৫টি পোস্টে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন ছিল। বাকিগুলো ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাদের পোস্ট। অনুসন্ধানে ব্যবহৃত শব্দটি ছিল ‘সাইন কপি’।
বিক্রেতাদের ভাষায়, ‘সাইন কপি’তে একজন ব্যক্তির এনআইডি ও ভোটার নম্বর, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, ঠিকানা, ভোটার এলাকা, ধর্ম, শারীরিক শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য এবং স্বাক্ষর বা আঙুলের ছাপের তথ্য থাকতে পারে।
অন্যদিকে ‘সার্ভার কপি’ বলতে নির্বাচন কমিশনের লোগোযুক্ত এমন একটি পিডিএফকে বোঝানো হয়, যাতে এনআইডির বিস্তারিত তথ্য থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব তথ্যকে সরকারি নথি বা সরকারি সংস্থার সার্ভার থেকে নেওয়া কপি হিসেবেও উপস্থাপন করা হচ্ছে।
একটি ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদক ‘Voter List’ নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান পান। সেখানে ‘Shibat Zubar’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে এনআইডি পাওয়ার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল।
একজন গ্রাহকের সম্মতি নিয়ে ওই ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ৫০০ টাকা অগ্রিম পাঠায় ডিসমিসল্যাব। ১৭ মিনিটের মধ্যে ‘Shibat Zubar’ একটি এনআইডির পিডিএফ পাঠায়।
পরে গ্রাহকের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হলে নাম, ছবি ও জন্মতারিখসহ সব তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। এমনকি দুই মাস আগে সংশোধন করা ওই ব্যক্তির মায়ের নামও নথিতে হালনাগাদ ছিল। একই পদ্ধতিতে অন্য একটি নম্বর ব্যবহার করেও সঠিক তথ্য পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ওই গ্রুপের ‘Help BD’ নামের অ্যাডমিনের বিজ্ঞাপনে এনআইডির পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, মোবাইলের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড, এসএমএসের তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিআইএন সনদ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্টের কপি এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদের তথ্য দেওয়ার কথাও বলা হয়।
২৫ জুন ক্রেতা সেজে ওই অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। মোবাইল নম্বর বা ভোটার নম্বর দিয়ে কী তথ্য পাওয়া যায় জানতে চাইলে তিনি জানান, তার একটি ওয়েবসাইট রয়েছে। সেখান থেকে ‘সার্ভার কপি’ বের করে পিডিএফ সরবরাহ করা যাবে।
পরে ১৫০ টাকা পাঠিয়ে একটি ভোটার নম্বর ও জন্মতারিখ দেওয়া হলে একটি এনআইডির পিডিএফ পাঠানো হয়। যাচাই করে সেটির তথ্যও সঠিক পাওয়া যায়। একইভাবে অন্য একজন পরিচিতের সম্মতি নিয়ে তার মোবাইল নম্বরের ‘সাইন কপি’ চাওয়া হলে ২৫০ টাকার বিনিময়ে সেটিও অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া যায়।
এরপর একই অ্যাডমিনের কাছে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের তিন মাসের কল ডিটেইল রেকর্ড চায় ডিসমিসল্যাব। ১ হাজার ৫০ টাকা পাঠানোর প্রায় আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ফাইলটি পাওয়া যায়।
ফাইলে থাকা সর্বশেষ ২০টি যোগাযোগের নম্বর, কলের সময় ও কলের ধরন ওই গ্রাহকের প্রকৃত কল হিস্ট্রির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি তথ্যই মিলে যায়।
সিডিআরে একজন ব্যক্তি কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন, কতক্ষণ কথা বলেছেন এবং কলটি করেছেন নাকি গ্রহণ করেছেন—এসব তথ্য থাকে। পাশাপাশি কলের সময় ফোনটি টুজি নাকি ফোরজি নেটওয়ার্কে ছিল, সেটিও জানা যায়।
এ ছাড়া ফোনের আইএমইআই এবং সিমের আন্তর্জাতিক মোবাইল সাবস্ক্রাইবার পরিচিতি বা আইএমএসআই নম্বরও এতে থাকতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট সিম কোন হ্যান্ডসেটে ব্যবহার করা হয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব।
কোনো কল বা এসএমএসের সময় সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরটি কোন মোবাইল টাওয়ার বা নেটওয়ার্ক সেলের আওতায় ছিল, সেই তথ্যও সিডিআরে থাকতে পারে। দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে একজন ব্যক্তির চলাচলের ধরনও অনুমান করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফেসবুক পোস্ট এবং সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সব ওয়েবসাইটের নকশা ও পরিচালন পদ্ধতি একই রকম। এসব সাইটের ড্যাশবোর্ডে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন সনদ, সিডিআর ও মোবাইলের অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্যের দাম উল্লেখ করা ছিল। অন্তত একটি ওয়েবসাইট ২০২৫ সালে নিবন্ধিত হয়েছে।
ওই ওয়েবসাইটগুলোর একটির মালিককে ওপেন সোর্স অনুসন্ধানের মাধ্যমে শনাক্ত করে ডিসমিসল্যাব। চাঁদপুরে থাকা ওই ব্যক্তি মোবাইল ফোন মেরামতের কাজ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে অর্থ পরিশোধের ১৬ মিনিটের মধ্যে নম্বরটির সর্বশেষ সক্রিয় থাকার সময়, মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, একটি ঠিকানা এবং গুগল ম্যাপের লিংক দেওয়া হয়।
তবে এসব তথ্যের উৎস সম্পর্কে বিক্রেতাদের করা সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু ‘সাইন কপি’ শব্দ ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালিয়েই ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ছয় শতাধিক বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।
এক মাসে পাওয়া এসব পোস্টে যোগাযোগের জন্য অন্তত ১১২টি আলাদা মোবাইল নম্বর ব্যবহার হতে দেখা যায়। এর মধ্যে একটি গ্রামীণফোন নম্বরই ৭৫টি পোস্টে ব্যবহৃত হয়েছে।
১০টি ওয়েবসাইটে তথ্য বিক্রির অর্থ গ্রহণের জন্য ১০টি আলাদা মোবাইল আর্থিক সেবা নম্বরও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৩৬টি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন বারবার দেখা গেছে।
এসব গ্রুপের অনেকগুলোর নামেই এনআইডি, সাইন কপি বা জন্মনিবন্ধন সেবার উল্লেখ ছিল। সাতটি গ্রুপে অন্তত পাঁচবার করে এ ধরনের পোস্ট পাওয়া যায়। ওই সাত গ্রুপেই মোট ১১৪টি প্রচারমূলক পোস্ট শনাক্ত করেছে ডিসমিসল্যাব।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি প্ল্যাটফর্মে একটি মাত্র কিওয়ার্ড ব্যবহার করেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার বাজারটির প্রকৃত পরিসর আরও বড় হতে পারে।
এই বাজারে একাধিক স্তরের বিক্রেতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা বিজ্ঞাপন দেন, তাদের অনেকেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার পাওয়ার পর তারা বিকাশ, নগদ, রকেট বা উপায়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে টাকা জমা দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি দামে তা বিক্রি করেন।
ফলে ওয়েবসাইটে দেওয়া দাম এবং সরাসরি বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া দামের মধ্যে পার্থক্য থাকে।
চাঁদপুরের ওই ওয়েবসাইট মালিক ডিসমিসল্যাবকে জানিয়েছেন, তিনি ৮০০ টাকায় মোবাইল গ্রাহকের কল তালিকা কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন। এ ছাড়া ১ হাজার টাকায় বিকাশ নম্বর খোলার সময় ব্যবহৃত পরিচয়পত্র এবং ৪ হাজার ৫০০ টাকায় ওই বিকাশ হিসাবের বিবরণ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তথ্য কীভাবে পাওয়া যায় জানতে চাইলে ওই বিক্রেতা দাবি করেন, তিনি আরেকটি গ্রুপ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। ওই গ্রুপ একটি এপিআই ব্যবহার করে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা পাশ কাটিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, একটি পুলিশ ডেটাবেজ থেকে এনআইডি ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে বিস্তারিত তথ্য খোঁজা যায় এবং সেখান থেকে এপিআই তৈরি করে তথ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
তবে এসব দাবির প্রযুক্তিগত সত্যতা এবং তিনি যাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন, তাদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ফেসবুকে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পোস্ট ২০২৩ সাল থেকেই থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের মার্চে একই ধরনের সেবা বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া একটি ইউটিউব ভিডিওও পাওয়া যায়।
একটি মোবাইল অপারেটর অনেক আগেই তথ্য বিক্রির বিষয়ে প্রমাণসহ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিল। তবে এরপরও এসব তথ্য বিক্রির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
কল ডিটেইল রেকর্ড ও গ্রাহকের মৌলিক অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য মোবাইল অপারেটরদের কাছে সংরক্ষিত থাকে।
এ বিষয়ে ডিসমিসল্যাবের প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণফোন লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, গ্রাহকের তথ্য ও ডেটা সুরক্ষাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। প্রচলিত আইন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা এবং অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিদের কাছেই গ্রাহকের তথ্য দেওয়া হয়।
রবি জানিয়েছে, সিডিআর, সিম নিবন্ধন ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য আইন অনুযায়ী অনুমোদিত সরকারি সংস্থাগুলোকে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেওয়া হয়।
একটি মোবাইল অপারেটরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, ওই অপারেটরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিস্টেমে বিটিআরসি, এনটিএমসি ও পুলিশ সদর দপ্তরসহ ১০টির বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রবেশাধিকার রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকের বিস্তারিত কল রেকর্ড ও সিম নিবন্ধনের সময় দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য দেখা ও পর্যবেক্ষণ করা যায়।
ওই কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, অপারেটর নিজস্ব তদন্তে দেখতে পেয়েছে যে কিছু তথ্য একটি সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার এপিআই ব্যবহার করে বাইরে যাচ্ছিল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর ওই সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। বিটিআরসিকেও বিষয়টি একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন ডিসমিসল্যাবকে জানান, প্রায় দুই মাস আগে এ বিষয়ে কাজ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল।
কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। পরে মন্ত্রণালয় বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকেও বিষয়টি জানানো হয়। আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডিসমিসল্যাব একটি সংবাদ প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এনটিএমসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছিল। ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ৭৮৯টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রুপে নাগরিকদের এনআইডি ও কল রেকর্ড বিক্রি হচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের একজন পুলিশ সুপার এবং র্যাব-৬-এর একজন সহকারী পুলিশ সুপারের লগইন তথ্য ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে। সাইবার অপরাধ শাখার একজন কনস্টেবল অর্থের বিনিময়ে সংবেদনশীল কল রেকর্ড বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ডিসমিসল্যাবকে বলেন, এ ধরনের ‘রিয়েল টাইম’ তথ্য সাধারণত তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কর্মীরা এতে যুক্ত থাকেন অথবা কোনো তৃতীয় পক্ষ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থার নিরাপত্তা পাশ কাটিয়ে প্রবেশাধিকার পায়। দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে কি না, তা নজরদারি করা জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
একজন ব্যক্তির এনআইডি, কল রেকর্ড বা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অন্যের হাতে চলে গেলে তা শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সুমন আহমেদ সাবির বলেন, বাংলাদেশে এনআইডি পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কারও এনআইডির সব তথ্য অন্যের হাতে গেলে তার নামে ভুয়া হিসাব খোলা, অন্য পরিচয়ে প্রতারণা করা কিংবা মিথ্যা পরিচয় তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তার মতে, কারও নামে ভুয়া বা অবৈধ আর্থিক লেনদেন করা হলে ওই ব্যক্তি আইনি ও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। অতিরিক্ত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যতে বৈধ হিসাব থেকেও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা যাবে না। কারও অধিকার লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগও রয়েছে।
তথ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনিক জরিমানার বিধান রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এ জরিমানা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিষয়ে মন্তব্য জানতে ডিসমিসল্যাব নির্বাচন কমিশন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ, এনটিএমসি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মোমিন তাদের জানান, এ বিষয়ে বক্তব্য পেতে কমিশনে লিখিত আবেদন করতে হবে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশার কাছে পাঠানো প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এনটিএমসির একজন কর্মকর্তাও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালকের কাছেও পরে ই-মেইলে সাক্ষাৎকারের অনুরোধ পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সেখান থেকেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
You cannot copy content of this page