সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতি সিলিন্ডারে ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে, সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে রান্নার গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
এলপিজির চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ার পরও বাজারে সংকট তৈরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মজুদ ও সরবরাহসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে চারটি কোম্পানির বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে প্রতি মাসে এলপিজির গড় চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। বিপরীতে মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার টন আমদানি হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে। ফলে পর্যাপ্ত আমদানির পরও বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। তখন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। খুচরা বাজারে তা ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
তবে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন ডিপোতে সরবরাহ কমতে শুরু করে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মোংলার এলপিজি টার্মিনাল থেকে ডিলাররা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে।
সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা—জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পৃথক প্রতিবেদনে চারটি এলপিজি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যোগসাজশে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি করা এলপিজি বাজারে সরবরাহ না করে নিজেদের ট্যাংকার ও বাল্ক স্টেশনে মজুদ করে রাখে। পাশাপাশি, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসার কথা থাকা ছয়টি জাহাজ সাগরে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এসব জাহাজে প্রায় ১৮ হাজার টন এলপিজি ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরিই ছিল এর উদ্দেশ্য বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে সরাসরি ভোক্তাদের ওপর। ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় এর চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাজারদর অনুযায়ী, ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা, যাত্রাবাড়ীতে ২ হাজার ২০০ টাকা এবং উত্তরা এলাকায় ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে দাম ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে জানা গেছে।
ফলে নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি সিলিন্ডারে ৭০০ টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
এলপিজির দামের ধারাবাহিক পরিবর্তনেও ভোক্তাদের ওপর চাপের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ২৩৫ টাকা এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৫৩ টাকা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাম ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা। এপ্রিলে তা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় পৌঁছায়। পরে সেপ্টেম্বরে কমে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও সর্বশেষ তা আবার ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন গত ১২ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। কমিশন বৃদ্ধি এবং কোম্পানিগুলোর ইচ্ছামতো দাম পরিবর্তন বন্ধসহ সাত দফা দাবি জানায় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।
এ পরিস্থিতিতে বুধবার এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই মন্ত্রী জানান, ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার না করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পরে বুধবার সন্ধ্যায় ব্যবসায়ীরা তাঁদের ঘোষিত দুই দিনের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা বলছেন, বাজারে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেনের মতে, কয়েক মাস ধরে এলপিজির বাজারে অস্থিরতা চললেও কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলমের অভিযোগ, অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করায় প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, আমদানি ব্যয় যাচাই, বাজার তদারকি জোরদার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো হলে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এলপিজির বাজারে অনিয়ম ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং জরিমানা করা হচ্ছে। দ্রুত বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এলপিজির মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, গণশুনানির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
এখন ভোক্তাদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত দামে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজারে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
You cannot copy content of this page