শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিব্যবস্থা ‘ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম’ চালু করেছে ওয়ালটন। এ ব্যবস্থার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সৌরশক্তি ব্যবহার করে ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য চালানোর প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর বসুন্ধরায় ওয়ালটন করপোরেট অফিসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ প্রযুক্তিব্যবস্থার উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওয়ালটনের তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব কারখানার ছাদে স্থাপিত ও ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে ৩২ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশ নিজস্ব শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় জাতীয় গ্রিডে বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করছে ওয়ালটন।
অনুষ্ঠানে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির চেয়ারম্যান এস এম শামছুল আলম, ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আশরাফুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম, পরিচালক এস এম রেজাউল আলম, এস এম মঞ্জুরুল আলম অভি এবং তাহমিনা আফরোজ তান্নাসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনের পর অর্থমন্ত্রী ওয়ালটনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্যানেল, সোলার পাওয়ার কেবল, স্টোরেজ ইনভার্টার, ব্যাটারি এবং সৌরশক্তিনির্ভর বিভিন্ন পণ্য ঘুরে দেখেন। এ সময় সোলার হাইব্রিড প্রযুক্তির ফ্রিজ, এসি ও স্মার্ট টিভির পাশাপাশি ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক কুকার, ওভেন, রাইস কুকার, বিএলডিসি ফ্যান, সৌরবিদ্যুৎচালিত পেডেস্টাল ও টেবিল ফ্যান, বাল্ব এবং স্ট্রিট লাইটের প্রযুক্তি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব জ্বালানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ওয়ালটনের এ উদ্যোগ সারা দেশে সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী বলেন, আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে কম খরচে জনগণের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি কমানো যাবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে।
তিনি আরও বলেন, সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে শুধু বাতি নয়, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন ও ওভেনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য চালানো সম্ভব। দেশের মানুষ সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে আরও এগিয়ে আসবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির চেয়ারম্যান এস এম শামছুল আলম বলেন, ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সবুজ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আশরাফুল আলম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ এবং গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজে সৌরশক্তিনির্ভর পণ্য ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা হলো ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম। এটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। একই সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও মৌলভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে।
ওয়ালটনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও কার্যকর ব্যবহারের সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। শুধু ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য তৈরি নয়, বরং দেশেই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরতে চায় ওয়ালটন।
ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেমের অন্যতম আকর্ষণ হাইব্রিড প্রযুক্তির ফ্রিজ, এসি ও স্মার্ট টিভি। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকলে এসব পণ্য ব্যাটারি ছাড়াই সরাসরি সৌরবিদ্যুতে চালানো যাবে। সৌরবিদ্যুতের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে পণ্যগুলো সচল থাকবে। ফলে সূর্যালোকের প্রাপ্যতা অনুযায়ী গ্রিডের বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।
এ ব্যবস্থায় এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (ইএসএস) প্রযুক্তির মাধ্যমে দিনের বেলায় সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা যাবে। এ প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক কুকার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রাইস কুকার ও বিএলডিসি ফ্যানের মতো গৃহস্থালি পণ্যও চালানো যাবে।
ওয়ালটনের ইনভার্টার ব্যাটারিতে সোলার চার্জার ও এসি চার্জার সমন্বিত থাকায় সৌরবিদ্যুৎ এবং প্রচলিত বিদ্যুৎ—উভয় উৎস থেকেই ব্যাটারি চার্জ করা সম্ভব হবে।
ওয়ালটনের সোলার ইকোসিস্টেমের আওতায় নতুন মডেলের তাকিওন ই-বাইকে যুক্ত করা হয়েছে ইন্টেলিজেন্ট ব্যাকআপ পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেমসমৃদ্ধ ব্যাটারি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ই-বাইককে মোবাইল এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ফলে পরিবহনের পাশাপাশি সৌরশক্তি সংরক্ষণ ও জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধাও পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ নিশ্চিত করতে ফটোভোলটাইক বা সোলার কেবল এনেছে ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এসব কেবলে নমনীয় টিনড কপার কন্ডাক্টর ও বিশেষ ইনসুলেশন ব্যবহার করা হয়েছে, যা অতিবেগুনি রশ্মি, আর্দ্রতা এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে ব্যবহারের উপযোগী।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ এবং গৃহস্থালি পণ্য পরিচালনা পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে ওয়ালটন। এ উদ্যোগ শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব কমানো এবং দেশের সৌরশক্তিনির্ভর প্রযুক্তি খাতের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
You cannot copy content of this page