নব্বই দশকের বাংলা রকসংগীতে নতুন এক ধারার জন্ম দিয়েছিলেন জেমস। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, গিটারের ভারী কর্ড আর ড্রামের তীব্র ছন্দের সঙ্গেও মাটির মানুষের গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও বেদনার মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব। তার গাওয়া গানগুলো শুধু সুরের মূর্ছনা নয়, অনেকের কাছে যেন একেকটি জীবন্ত কাব্য।
জেমস—বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে যিনি পরিচিত ‘নগরবাউল’ নামে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। ভক্তদের কাছে তিনি ‘গুরু’, আবার সংগীতপ্রেমীদের কাছে তার গান হয়ে উঠেছে আনন্দ, আবেগ ও নস্টালজিয়ার এক অনন্য মাধ্যম।
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের মানচিত্র বদলে দেওয়া এই শিল্পীর পথচলার শুরুটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। প্রথাগত সংগীতের সীমানা ভেঙে তিনি বেছে নিয়েছিলেন গিটারের শক্তিশালী কর্ডের সঙ্গে মেঠো সুরের এক অভিনব সংমিশ্রণ। তার রূঢ় অথচ মায়াবী কণ্ঠে যখন উচ্চারিত হয় ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব তুমি আমার’, ‘মীরা বাঈ’, ‘সুলতানা বিবিয়ানা’ কিংবা ‘বাবা কতদিন দেখি না তোমায়’, তখন শ্রোতার মনে তৈরি হয় গভীর আবেগ ও আলোড়ন।
জেমসের গানে একদিকে যেমন উঠে এসেছে নগরজীবনের যান্ত্রিকতা, নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে তেমনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে মাটি ও মানুষের প্রতি টান। প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব, প্রতিবাদ কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা—বিভিন্ন অনুভূতিকে তিনি নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও পরিবেশনার মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
তার কণ্ঠের স্বকীয় রূঢ় মাদকতা জেমসকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। মঞ্চে তার উপস্থিতি মানেই দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর হাজারো তরুণের উন্মাদনা। তার গায়কী ও পরিবেশনায় তৈরি হয় এক ধরনের সম্মোহনী আবহ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে আসছে।
তবে মঞ্চের বাইরের জেমস অনেকটাই অন্তর্মুখী ও প্রচারবিমুখ। দীর্ঘ সংগীতজীবনে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের জীবনবোধ ও বাস্তবতাকে তিনি তার সৃষ্টির বাইরে রাখেননি। তার গানে যেমন বিদ্রোহের সুর শোনা যায়, তেমনি থাকে নিখাদ নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা ও হারানোর বেদনা। মানুষের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন ও হতাশার গল্পই বারবার জায়গা পেয়েছে তার সংগীতে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলা গানকে পরিচিত করে তুলেছেন জেমস। বলিউডের মূলধারার সংগীতেও তার কণ্ঠ ও সুরের উপস্থিতি বাংলা সংগীতের জন্য নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করে। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সংগীতের আবেগ ও আবেদন কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে থাকে না।
সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন বদলেছে, বদলেছে শ্রোতাদের রুচিও। কিন্তু জেমসের কণ্ঠের সেই চেনা স্বর ও পরিবেশনার স্বাতন্ত্র্য আজও অটুট। বরং দীর্ঘ পথচলায় তার কণ্ঠ ও শিল্পীসত্তা আরও পরিণত ও ঋদ্ধ হয়েছে।
জেমস শুধু একজন রকস্টার নন; বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার গান ও শিল্পীসত্তা বাংলা সংগীতের কয়েকটি প্রজন্মের শ্রোতার স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আজ এই জনপ্রিয় শিল্পীর জন্মদিনে তার প্রতি রইল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
You cannot copy content of this page