র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক–বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এদিন প্রথমেই আসামিপক্ষের করা অব্যাহতির আবেদন খারিজ করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন আদালত। একইসঙ্গে গ্রেপ্তার আসামিদের একে একে অভিযোগ পড়ে শোনানো হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া শেষে সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হবে, যা অভিযোগ গঠনের ন্যূনতম ২১ দিন পর নির্ধারিত হওয়ার কথা।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে রয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদীসহ অন্যান্যরা। গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিদের পক্ষে আইনজীবীরাও শুনানিতে অংশ নেন।
সকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও সেনা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সকাল ১০টার পর ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে গ্রেপ্তার ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন— র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ সাতজন এখনও পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন— শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম।
এর আগে ২১ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার দিন নির্ধারিত থাকলেও আসামিপক্ষের আবেদনের পর দুই দিন পিছিয়ে আজ আদেশ দেওয়া হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সময় চাইলেও চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বিচারকাজ বিলম্বের অভিযোগ তোলেন।
গত ৩ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর টিএফআই সেলের ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ কেউ পরে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হতো, আর অনেককে দীর্ঘদিন গুম রেখে অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রাখা হতো। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘নতুন বাংলাদেশ’ উদিত হয়েছে।
৮ অক্টোবর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল ১৭ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২২ অক্টোবর সেনা হেফাজতে থাকা ১০ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পলাতক আসামিরা হাজির না হওয়ায় আদালত তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেন।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয়