আজ বুধবার (১ জুলাই) ১০৬ বছরে পদার্পণ করল ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। ১৯২১ সালের এই দিনে মাত্র ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী, ৬০ জন শিক্ষক, তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে ৪২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, প্রায় দুই হাজার শিক্ষক, ১৩টি অনুষদ ও ৮৩টি বিভাগ নিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এবারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চ শিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান—দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ও জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের সংকটময় সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার এই ঐতিহ্যই প্রতিষ্ঠানটিকে জাতির প্রত্যাশার প্রতীকে পরিণত করেছে।
গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থাকলেও শতবর্ষ পেরিয়ে ১০৬ বছরে এসেও আবাসন সংকট, নিরাপত্তা, হলের খাবারের মান এবং গবেষণার সীমিত অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ হাজার ৮৮১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। অথচ ১৯টি আবাসিক হল ও চারটি হোস্টেল থাকা সত্ত্বেও মোট শিক্ষার্থীর ৫৩ শতাংশেরও বেশি আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
২০ হাজার ৭২৯ জন ছাত্রীর মধ্যে মাত্র ৭ হাজার ২১০ জন (৩৪.৭৮ শতাংশ) হলে থাকতে পারেন। বাকি ৬৫.২২ শতাংশকে হলের বাইরে থাকতে হয়। অন্যদিকে ২২ হাজার ১৫২ জন ছাত্রের মধ্যে ১২ হাজার ৭৬৯ জন (৫৭.৬৪ শতাংশ) আবাসনের সুযোগ পান।
ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী রাজধানীর বিভিন্ন মেস ও সাবলেটে উচ্চ ভাড়া, নিম্নমানের পরিবেশ ও যানজটের মধ্যে বসবাস করছেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা। প্রশাসনের নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, হয়রানি এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ এখনো রয়ে গেছে।
এক নারী শিক্ষার্থী জানান, সন্ধ্যার পর টিউশন শেষে হলে ফিরতে গেলেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা কাজ করে। তার মতে, নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই যদি নিরাপত্তাহীনতা থাকে, তবে শিক্ষার্থীরা স্বস্তিতে চলাফেরা করবেন কীভাবে।
আবাসিক হলগুলোর ক্যান্টিনে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, খাবারের গুণগত মান সন্তোষজনক নয়, অনেক সময় বাসি খাবার পরিবেশন করা হয় এবং তুলনামূলক বেশি মূল্য নেওয়া হয়।
মাস্টার দা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, বহু বছর ধরে অভিযোগ জানানো হলেও সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি। তিনি নিয়মিত তদারকি ও খাদ্যের মানোন্নয়নের দাবি জানান।
ডাকসুর সদস্য ও সিনেট সদস্য সাবিকুননাহার তামান্না বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ও পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে বাজেটে কার্যকর কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তিনি হল ক্যান্টিনের উন্নয়ন ও নতুন ক্যান্টিন নির্মাণে দ্রুত বরাদ্দের দাবি জানান।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
সিনেট অধিবেশনে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, গবেষণায় মূল বাজেটের মাত্র দুই শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ও ইউজিসির দেওয়া বরাদ্দেরও পুরোটা ব্যয় হয় না বলে তিনি অভিযোগ করেন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
তিনি জানান, ২০২৬ থেকে ২০৪৬ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (ডিইউএপি)’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে গবেষণাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা, দক্ষ প্রশাসন এবং উদ্ভাবনভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, আবাসন সংকট দূর করতে নতুন হল নির্মাণসহ একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে। পাশাপাশি পূর্বাচলে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নিরাপদ ক্যাম্পাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি শুধু প্রশাসনের নয়, পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রক্টরিয়াল বডি নিয়মিত কাজ করছে।
হলের খাবারের মান উন্নয়নে ভবিষ্যতে বিভিন্ন উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
১০৬তম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
সকাল সাড়ে ৯টায় বিভিন্ন হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হওয়ার মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে উপাচার্যের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হবে।
ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনা সভা ও বিকেলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আজ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্লাস বন্ধ থাকলেও নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে দিবসের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আজ দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যানবাহন প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত ও জরুরি সেবার যানবাহন ছাড়া অন্য যানবাহনের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
You cannot copy content of this page