একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, অন্যদিকে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি—এই দুইয়ের চাপে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, দাম সমন্বয়ের আগে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল।
এই পরিস্থিতিতে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের তুলনামূলক কম দামের জ্বালানি প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তবে দাম বাড়ানোর পরও বিপিসির আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটছে না। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে তাদের ব্যবহারযোগ্য কার্যকরী মূলধন ছিল প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া গেলেও অক্টোবর থেকে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
বিপিসি জানিয়েছে, আমদানি কার্যক্রম সচল রাখতে তাদের আরও অর্থের প্রয়োজন। এরই মধ্যে জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা অর্থের একটি অংশও ব্যবহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকার লোকসানের বড় কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। সরকার দীর্ঘ সময় দেশের বাজারে সেই বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ভোক্তার ওপর না চাপানোয় লোকসানের বড় অংশ বিপিসিকেই বহন করতে হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের আগে শুধু ডিজেল বিক্রিতেই প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছিল।
সরকারের হিসাবে, লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বিপিসির ওপর ভর্তুকি ও আর্থিক চাপ পুরোপুরি দূর হবে না।
বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। দেশের মোট পেট্রোলিয়াম জ্বালানির চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে সরবরাহ ও পরিবহন খাতেও দেখা দিতে শুরু করেছে। চট্টগ্রামের বেসরকারি আইসিডিগুলো জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ছয় ধরনের সেবামূল্য ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় পণ্য পরিবহন, সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে শুধু দাম বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়, জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং অপচয় ও পাচার নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ধাপে ধাপে দেশের বাজারেও দাম সমন্বয় এবং কমলে কমানোর ব্যবস্থা থাকলে একবারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন কমতে পারে।
এ ছাড়া পরিবহন ব্যবস্থায় জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা, কৃষিতে সৌরচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি চুরি ও পাচার রোধে ডিজিটাল নজরদারি এবং আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফায় সমন্বয় করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা ছিল। এপ্রিলে দাম বাড়ানোর পর সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ ২০ টাকা করে বৃদ্ধির ফলে এখন চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম যথাক্রমে ১৩৫, ১৫৫, ১৬০ ও ১৬৫ টাকা।
ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য বিপিসির লোকসান কমানো হলেও এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং শিল্পের পরিচালন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিপিসির আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
You cannot copy content of this page