ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনের বিরুদ্ধে ভূখণ্ড দখল এবং ভারতীয় সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের মিত্র একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে এসব দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চীনের কথিত ভূখণ্ড দখলের বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নতুন অভিযোগের কেন্দ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম আপার সুবানসিরি জেলা। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবেদনটি ভারত ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। জম্মু ও কাশ্মির, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত এই সীমান্তের বড় অংশই বিতর্কিত। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) কোথায়—এ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে।
প্রাথমিক অভিযোগের পর অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল চার সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দলকে ওই এলাকায় পাঠায় বলে দলটির সহ-সভাপতি কালিং জেরাং জানিয়েছেন। দলটি পরিদর্শন শেষে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে।
জেরাংয়ের দাবি, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাসিং এলাকায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত টহল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আকস্মিক বন্যা, প্রবল বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসের কারণে ওই সময়ে যোগাযোগ ও চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সময়েও সীমান্ত এলাকায় চীনা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত থাকে। ফলে সীমান্তে ভারতের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেরাং আরও দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি টহল পয়েন্ট ছেড়ে দেয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যবহৃত কিছু জমি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তাঁর দাবি, সীমান্তে চীনের কথিত অনুপ্রবেশ কোনো নতুন ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটেছে।
গত মাসে স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে সীমান্ত এলাকায় চীনের কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
চীনা বাহিনীর কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘ভুল ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়কে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি দুই দেশের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, চীনও নতুন কোনো সীমান্ত উত্তেজনার বিষয় সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল।
তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দেশ সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ বজায় রেখে সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের শিকড় ঐতিহাসিকভাবে গভীর। ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনে ব্রিটিশ ভারত ও তৎকালীন তিব্বতের মধ্যে ম্যাকমোহন রেখা নির্ধারণ করা হয়। স্বাধীনতার পর ভারত এই রেখাকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
তবে চীন ম্যাকমোহন রেখাকে স্বীকৃতি দেয় না। বেইজিংয়ের দাবি, সিমলা কনভেনশনের আলোচনায় চীন অংশ নেয়নি।
চীন পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে অভিহিত করে। কাশ্মিরের বিতর্কিত আকসাই চিন অঞ্চলও চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দুই দেশের টহল দল এমন অঞ্চলে প্রবেশ করে, যেগুলো উভয় পক্ষই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন। এরপর সীমান্তজুড়ে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বেড়ে যায়।
সিকিমের নাকু লা এলাকাতেও ২০২০ সালের মে ও ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উত্তরাখণ্ডের বারাহোতি ও হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা অঞ্চল নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৭ সালে ভারত, চীন ও ভুটানের ত্রিদেশীয় সীমান্তবর্তী ডোকলাম এলাকায় সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে ৭৩ দিনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বেইজিংয়ে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে বাণিজ্যের বড় অংশই চীন থেকে ভারতের আমদানিনির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানি বেড়ে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চীনে ভারতের রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত বিরোধ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো বর্তমানে চীন-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তাদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক সম্পর্কের পরিবর্তে ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত। অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ বিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে যাবে।
You cannot copy content of this page