হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলা হয়। বুধবার (১২ আগস্ট) পালিত হচ্ছে আখেরি চাহার সোম্বা।
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ শব্দবন্ধটি আরবি ও ফারসি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ‘চাহার’ অর্থ চার বা শেষের এবং ‘সোম্বা’ অর্থ বুধবার। প্রচলিত অর্থে এর অর্থ দাঁড়ায়—সফর মাসের শেষ বুধবার।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অসুস্থতা থেকে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। এ সময় সাহাবায়ে কেরাম আনন্দিত হয়ে দান-সদকা ও শুকরিয়া আদায় করেছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
এ কারণে বিশ্বের কিছু অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসলমান এ দিনে দান-সদকা ও নফল ইবাদত করে থাকেন। বাংলাদেশেও দিনটি উপলক্ষে সরকারি ছুটির তালিকায় ঐচ্ছিক ছুটি রয়েছে। তবে আখেরি চাহার সোম্বা পালন নিয়ে আলেম ও ইসলামি গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
যারা দিনটি পালন করেন, তাদের মধ্যে মহানবী (সা.)-এর অসুস্থতা নিয়ে দুটি ধরনের বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে। কারও মতে, সপ্তম হিজরিতে জাদুর প্রভাবে অসুস্থ হওয়ার পর সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি সুস্থতা লাভ করেন।
অন্য একটি মত অনুযায়ী, মহানবী (সা.) ইন্তিকালের আগে যে অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই অসুস্থতার সময় সফর মাসের শেষ বুধবার কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন এবং মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন। সে সময় হজরত আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দেন বলে বর্ণনা রয়েছে।
তবে এসব বর্ণনার ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
কিছু আলেম ও গবেষকের মতে, মহানবী (সা.) ঠিক কোন দিনে সুস্থতা অনুভব করেছিলেন, তা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। তাঁর অসুস্থতার বিষয়ে একাধিক হাদিসে বর্ণনা থাকলেও নির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ নেই।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা সফর মাসের শেষ কয়েক রাত অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে হয়েছিল। আবার তাঁর অসুস্থতার সময়কাল নিয়েও বিভিন্ন মত রয়েছে।
কেউ বলেছেন ১০ দিন, কেউ ১২ দিন, কেউ ১৩ দিন আবার কেউ ১৪ দিন অসুস্থ থাকার পর মহানবী (সা.) ইন্তিকাল করেন। অসুস্থতা শুরুর দিন নিয়েও শনিবার, বুধবার ও সোমবার—বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।
এ কারণে গবেষক আলেমদের একটি অংশের মতে, নির্দিষ্টভাবে সফর মাসের শেষ বুধবারকে মহানবী (সা.)-এর সুস্থতার দিন হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
প্রচলিত কিছু গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, মহানবী (সা.) সুস্থতা অনুভব করলে সাহাবায়ে কেরাম আনন্দিত হয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ আল্লাহর পথে দান করেছিলেন। আবু বকর (রা.), ওমর (রা.), উসমান (রা.), আলী (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর দানের কথাও এসব বর্ণনায় পাওয়া যায়।
তবে এসব বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও ইসলামি গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক গবেষক এগুলোকে ভিত্তিহীন বা দুর্বল বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যেসব আলেম দিনটি পালনের বিরোধিতা করেন, তাদের বক্তব্য হলো—মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় বা তাঁর ইন্তিকালের পর সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িরা নিয়মিতভাবে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে পালন করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ ধর্মীয় আমলের জন্য নির্ধারণ করতে হলে কোরআন, সহিহ হাদিস বা নির্ভরযোগ্য শরিয়তসম্মত প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ইসলামে অনুমোদিত নয়—এমন কোনো আমল করা হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ ধর্মীয় আমল হিসেবে পালন করা উচিত কি না, সে বিষয়ে ব্যক্তিকে নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতামত ও সহিহ দলিল অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
You cannot copy content of this page