ইরানের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে টানা ১২তম রাতের মতো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আঞ্চলিক জলসীমায় বেসামরিক নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি তৈরির সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার লক্ষ্য ছিল এমন সামরিক সক্ষমতা, যা আঞ্চলিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে হামলার পর ইরান কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “যে অঞ্চলে আমরা তেল বিক্রি করতে পারব না, সেখানে অন্য কেউও তেল বিক্রি করতে পারবে না। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে ইরানের পাল্টা জবাবও চলতে থাকবে।
বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভোরে ইরানের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে হামলা চালানো হয়। এতে বুশেহর, খুজেস্তান ও হরমোজগান প্রদেশের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ ও রামশির শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া হরমোজগান প্রদেশের সিরিক শহরের জিয়ারাত গ্রামের কাছেও বিস্ফোরণ হয়েছে।
আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, খুজেস্তানের বন্দর মাহশাহর এলাকার কাছেও বিস্ফোরণ হয়েছে। অন্যদিকে ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বুশেহর শহরের আশপাশেও অন্তত দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
বুশেহরের গভর্নর মোহাম্মদ মোজাফফারি জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে পাশের একটি গ্রামে প্রায় দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
গত সপ্তাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানজুড়ে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এর জবাবে তেহরান জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে তাদের পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকবে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দেন। সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, সামরিক কাজে ব্যবহৃত না হলে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ উঠেছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া মার্কিন হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৩ জন নিহত এবং ৫৯০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান এ সপ্তাহে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে একাধিক হামলা চালিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। কুয়েতের পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনাও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
গত শুক্রবার জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। এছাড়া রোববার ইরাকের এরবিলে একটি ড্রোন প্রতিহত করার সময় আরও এক মার্কিন সেনা প্রাণ হারান।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানের হামলায় নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা, আনাদোলু, ফার্স নিউজ ও তাসনিম নিউজ।
You cannot copy content of this page