ডারউইন টেস্টে তিন দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে বাংলাদেশ। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর তানজিদ হাসান তামিমের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি ও মেহেদী হাসান মিরাজের লড়াকু ৬৫ রানে বড় লিড নেয় বাংলাদেশ।
তৃতীয় দিনের খেলা শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করেছে অস্ট্রেলিয়া। এখনও ৬৭ রানে পিছিয়ে রয়েছে স্বাগতিকরা। ফলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বপ্ন এখন জোরালো হয়েছে বাংলাদেশের।
রোববার চতুর্থ দিন শুরু করবেন ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারি। গ্রিন ৪৩ এবং ক্যারি ১৯ রানে অপরাজিত রয়েছেন। তাদের পর অস্ট্রেলিয়ার হাতে ব্যাটিংয়ে রয়েছেন বো ওয়েবস্টার। তবে শুধু বাংলাদেশের লিড পেরোলেই হবে না, ম্যাচে ফিরতে হলে এরপর বাংলাদেশকে জয়ের মতো লক্ষ্যও দিতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে।
তৃতীয় দিনের শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির ছিল না। আগের দিন ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ দিনের চতুর্থ ওভারেই হারায় হাসান মাহমুদকে। জশ হ্যাজেলউডের বলে ১৪ রান করে ফেরেন তিনি। এরপর তাইজুল ইসলামও ১৭ রান করে একই বোলারের শিকার হন।
তখন বাংলাদেশের লিড ছিল প্রায় ১৭৪ রান। সেখান থেকে মেহেদী হাসান মিরাজ হাল ধরেন। তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও তাইজুল ইসলামের সঙ্গে ছোট ছোট জুটি গড়ে দলকে বড় লিড এনে দেন তিনি।
মিরাজ ১৫৪ বলে ৬৫ রান করেন। তার ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার ও একটি ছক্কা। তাসকিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে নবম উইকেটে ৪৬ রানের জুটিও গড়েন তিনি।
শেষ পর্যন্ত হ্যাজেলউডের বলে অ্যালেক্স ক্যারির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন মিরাজ। এরপর বেশিক্ষণ টেকেনি বাংলাদেশের ইনিংস। ১৩৮ ওভারে ৪২৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। তাসকিন ৩২ বলে ১৪ রানে অপরাজিত থাকেন।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে হ্যাজেলউড ৬ উইকেট নেন এবং নিজের ৩০০তম টেস্ট উইকেট পূর্ণ করেন।
বাংলাদেশের ৪২৬ রানের ইনিংস শুধু বড় লিডই এনে দেয়নি, গড়েছে একটি রেকর্ডও। ১৩৮ ওভার ব্যাট করেছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের সিডনি টেস্টে ভারতের ১৬৭.২ ওভারের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো সফরকারী দল এক ইনিংসে এত বেশি ওভার ব্যাট করেনি।
বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের ভিত অবশ্য তৈরি হয়েছিল আগের দিন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তানজিদ হাসান তামিম। ১৯৭ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। নাজমুল হোসেন শান্ত করেন ৮৪ রান এবং মুমিনুল হক থামেন ৪৯ রানে।
২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেই চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও জেইক ওয়েদারল্ডকে ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। নিজের প্রথম ওভারেই বোল্ড করে শূন্য রানে ফেরান এই ওপেনারকে।
এরপর দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে ট্রাভিস হেডকেও সাজঘরে পাঠান হাসান। ৩৫ বলে ১৭ রান করে বোল্ড হন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
দুই ইনিংসেই অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারকে ফেরানোর বিরল কীর্তি গড়েছেন হাসান মাহমুদ। বাংলাদেশের হয়ে এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু রবিউল ইসলামের।
হাসানের দুই আঘাতের পর মার্নাস লাবুশেন ও স্টিভেন স্মিথ কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন। তবে সেই জুটিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। লাবুশেনকে ৩১ রানে ফেরান তাইজুল ইসলাম। এরপর স্মিথকে ৪৪ রানে থামান মেহেদী হাসান মিরাজ।
৪ উইকেটে ১১৮ রান থেকে অস্ট্রেলিয়ার চাপ আরও বাড়ে। দিনের বাকি সময়টা সামলে নেন ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারি। তাদের ব্যাটে ভর করে ৪ উইকেটে ১৬১ রানে দিন শেষ করে স্বাগতিকরা।
বাংলাদেশের সামনে এখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের বড় সুযোগ। তিন দিনের পারফরম্যান্সে সেই সম্ভাবনাই জোরালো হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে চতুর্থ দিনের প্রথম লক্ষ্য বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড পেরোনো। এরপর বড় সংগ্রহ করে বাংলাদেশকে দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়ে নামানো। সে জন্য গ্রিন ও ক্যারির জুটিকে বড় করতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে।
পরিসংখ্যানও বাংলাদেশের পক্ষেই কথা বলছে। ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ১০০ বা তার বেশি রানে পিছিয়ে থেকেও এই শতাব্দীতে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট জিতেছে মাত্র একবার। ২০১০ সালে সিডনিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০৬ রানে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ ঘুরিয়ে জয় পেয়েছিল তারা।
তবে বাংলাদেশও অতীতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বড় লিড পেয়েও জয় নিশ্চিত করতে পারেনি। ২০০৬ সালের ফতুল্লা টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১৫৮ রানের লিড নিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে রিকি পন্টিংয়ের সেঞ্চুরিতে ম্যাচ ঘুরিয়ে জয় পায় অস্ট্রেলিয়া।
তবে ডারউইনে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রথম দিন হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়া, দ্বিতীয় দিনে তানজিদের সেঞ্চুরি ও শান্তর ৮৪ রান, তৃতীয় দিনে মিরাজের ৬৫ রানে লিড ২২৮-এ নেওয়া এবং এরপর হাসান, তাইজুল ও মিরাজের বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার চার উইকেট তুলে নেওয়া—সব মিলিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখন বাংলাদেশের হাতেই।
You cannot copy content of this page