ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। বিক্ষোভ ঠেকাতে মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ, ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ, ধরপাকড় এবং মধ্য দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা স্থগিতের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এতে রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবন ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তরমন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠন। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে তারা। তবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, কর্মসূচি আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকায় আয়োজকদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
বিক্ষোভকে ঘিরে ধরপাকড়ের অভিযোগও উঠেছে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে দিল্লিগামী উড়োজাহাজ থেকে নামার পর আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে আটকের খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব আটকের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির লোধি এস্টেটে নিজের বাসার সামনে থেকে আটক হন কেজরিওয়াল। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাকেত গোখলে দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের কয়েকজন নেতাকে দিল্লিতে তাঁদের বাসভবনের বাইরে থেকে আটক করেছে পুলিশ। ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর বাসা থেকে আটক করা হয়েছে বলেও খবরে উল্লেখ করা হয়।
সিজেপির অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ভণ্ডুল করতে এবং নেতাদের কর্মসূচিস্থলে পৌঁছানোর আগেই নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁদের আটক করা হয়েছে। দলটি অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে। দলটির ভাষ্য, এ ধরনের পদক্ষেপ নাগরিকদের চলাচল ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
বিক্ষোভ ঘিরে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে কয়েক হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, সম্ভাব্য জমায়েত নিয়ন্ত্রণে তাদের ১৫ হাজারের বেশি সদস্যের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে গণপরিবহনেও প্রভাব পড়েছে। দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনের নির্দেশনায় ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান ফটক বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ন্যামো ভারত ট্রেনের সরাই কালে খাঁ ও নিউ অশোক নগর স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া গেছে। যানজটের আশঙ্কায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত কিছু মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিলের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভস্থল যন্তরমন্তর এবং আশপাশের সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থানপথে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সমাবেশ, মিছিল ও সড়ক অবরোধের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত আরও আগে। সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ মাসে এ কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সাল থেকে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের দাবি, এসআইআর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পুরো কমিশনের সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে একই দাবিতে বিক্ষোভ করেছিল সিজেপি। সেই কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। তবে অনুমতি না থাকায় কর্মসূচি আয়োজন করতে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে দিল্লিতে আটক হওয়ার দিনই অভিজিৎ দীপকের দাদি মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার সান্তুক পিম্পরি গ্রামে মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বয়সজনিত অসুস্থতায় শনিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাদির মৃত্যুর খবর দীপকেকে জানানো হয়েছে এবং শেষকৃত্যে অংশ নিতে তাঁকে মহারাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, মানবিক বিবেচনায় তাঁকে সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। তবে শেষকৃত্যে অংশ নেবেন, নাকি দিল্লিতে আটক অবস্থায় থাকবেন—সে সিদ্ধান্ত দীপকের।
বিক্ষোভ, রাজনৈতিক নেতাদের আটক এবং গণপরিবহনে বিধিনিষেধ নিয়ে দিল্লির পরিস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আটকের সংখ্যা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিবহনসংক্রান্ত তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
You cannot copy content of this page