নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার আগে যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, সেটি কোনো ভূমিকম্পের কারণে হয়নি। বরং হিমবাহ ধস ও ভূমিধস থেকে ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় ইউএসজিএস জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে কাঠমান্ডুর উত্তরে যে কম্পনটি প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের কারণে সৃষ্টি হয়। এর পরিণতিতে ভাটির দিকে (downstream) ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখা দেয়।
ইউএসজিএস স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ওই সময়ে সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি।
এর আগে প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুয়াগাধি সীমান্তপথের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধস নেমেছিল। এতে লেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়।
লেন্দে খোলা চীন থেকে নেপালে প্রবাহিত ভোতে কোশি নদীর একটি উপনদী। ধারণা করা হচ্ছে, শক্তিশালী ওই ধসের কারণেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। পরে ধসের ঘটনাটি ভূমিকম্পের সমতুল্য ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে তিব্বতের দিক থেকে ভোতে কোশি নদীতে প্রবল ঢল নামে। এতে নেপালের রাসুয়া, ধাদিং ও নুয়াকোট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা জীবিত ও মৃতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পর অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এদিকে তিব্বতের অংশে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গিয়রং এলাকায় তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা যাচাইয়ের পাশাপাশি সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
তিব্বতের দিকের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা গেছে, মানুষজন দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর কিছুক্ষণ পরই পাথর, কাদা ও পানির বিশাল ঢল ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে জড়ো হন। ওই কেন্দ্র থেকেই হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বন্যায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে নিখোঁজদের তালিকা তৈরির সময় পুলিশকে মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া বহু ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন কাদা ও পানিতে ডুবে গেছে কিংবা ভূমিধসে চাপা পড়েছে। দিনভর হেলিকপ্টারে করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধার করা হয়েছে।
গত বছরও নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একই অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে পড়ায় ওই বন্যা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ওই ঘটনায় নয়জন নিহত এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এবারের ঘটনায় স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ও ইউএসজিএসের তথ্য—দুটিই ইঙ্গিত করছে, আকস্মিক বন্যার পেছনে ভূমিকম্প নয়; বরং হিমবাহ ও বরফ-পাথরের ধসই মূল কারণ ছিল।
You cannot copy content of this page