দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শুধু বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি পরিচয় দিয়ে এখন থেকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি (শিল্প) হওয়া যাবে না। সিআইপি মর্যাদা পেতে একজন উদ্যোক্তাকে তার ব্যবসার প্রকৃত উৎপাদন, বিনিয়োগ, মুনাফা, কর ও ভ্যাট পরিশোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, পরিবেশ সুরক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনসহ অর্থনীতিতে বাস্তব অবদানের প্রমাণ দিতে হবে।
এ জন্য সিআইপি (শিল্প) নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ১০০ নম্বরের স্কোরভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। পাশাপাশি শিল্প খাতে সিআইপির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে বছরে সর্বোচ্চ ৫৫ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে এবার সিআইপি মর্যাদা পাওয়া আগের তুলনায় আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয় গত ২৩ আগস্ট ‘বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (শিল্প) নির্বাচন নীতিমালা, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে ২০০৮ সালের নীতিমালা বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—ব্যবসার আকার বা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতির পরিবর্তে এখন পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য অর্থনৈতিক অবদানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থাৎ কার কত বড় প্রতিষ্ঠান বা কত বেশি সম্পদ রয়েছে, তার চেয়ে তিনি বাস্তবে কত উৎপাদন করছেন, কত বিনিয়োগ করছেন, কত কর দিচ্ছেন এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন—এসব বিষয়ই হবে সিআইপি হওয়ার মূল বিবেচনা।
এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি প্রদান কার্যক্রম বাতিল করেছে। গত ৫ মে এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ২০২৩ সালের জন্য প্রস্তাবিত বা ইস্যু করা সিআইপি কার্ড প্রদান-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বাতিল করেছিল সরকার।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৫ জুন ২০২১ সালে অর্থনীতিতে অবদানের জন্য ১৮০ জন ব্যবসায়ীকে সিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রফতানি খাতে ১৪০ জন এবং বাণিজ্য খাতে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালকদের পদাধিকারবলে ৪০ জনকে সিআইপি করা হয়।
ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, অর্থনীতিতে প্রকৃত অবদান রাখা উদ্যোক্তাদের মূল্যায়নের জন্য একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন। নতুন নীতিমালায় সেই দাবির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
নতুন নীতিমালায় বড় ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে উৎপাদনের জন্য রাখা হয়েছে ২০ নম্বর।
পরিশোধিত মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি মোট বিনিয়োগে ১০, কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১৫, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ১০, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে ১০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১০ নম্বর রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, রফতানি আয়, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক অবদানের জন্যও নম্বর থাকবে।
অর্থাৎ শুধু বড় কারখানার মালিক হলেই সিআইপি হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারখানায় কত উৎপাদন হচ্ছে, কত বিনিয়োগ হয়েছে, সরকারকে কত কর ও ভ্যাট দেওয়া হয়েছে এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে উদ্যোক্তার অবস্থান নির্ধারণ করা হবে।
নতুন নীতিমালায় ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্যও আলাদা মূল্যায়ন কাঠামো রাখা হয়েছে।
ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদনের জন্য ২০ নম্বরের পাশাপাশি স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের জন্য ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১০, কর্মসংস্থানে ১০, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১০ এবং পরিশোধিত মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ৫ নম্বর রয়েছে।
ফলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক আকারে প্রতিযোগিতা করতে না পারলেও উৎপাদন, স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, কর্মসংস্থান, কর প্রদান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তারাও সিআইপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় আসতে পারবেন।
সেবা খাতের জন্যও রাখা হয়েছে আলাদা স্কোরিং ব্যবস্থা। এ খাতে মোট বিনিয়োগে সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর, কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১৫, টার্নওভারে ১০ এবং আয়কর-পূর্ববর্তী মুনাফায় ১০ নম্বর রয়েছে।
এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মেধাস্বত্ব গ্রহণ ও সংরক্ষণ, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার, কর্মসংস্থান, রফতানি আয় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপরও নম্বর দেওয়া হবে।
নতুন নীতিমালায় শিল্প খাতে সিআইপির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। আগে শিল্প খাতে সিআইপির সংখ্যা ১৮৪ জন পর্যন্ত হয়েছিল। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪০। নতুন নীতিমালায় বছরে সর্বোচ্চ ৫৫ জনকে সিআইপি (শিল্প) নির্বাচনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে বৃহৎ শিল্পে উৎপাদন খাতে ১৫ ও সেবা খাতে ৫ জন, মাঝারি শিল্পে উৎপাদনে ১০ ও সেবায় ৩ জন এবং ক্ষুদ্র শিল্পে উৎপাদনে ৪ ও সেবায় ২ জন সিআইপি হবেন।
এ ছাড়া উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে ৫, হাইটেক শিল্পে ৩, লজিস্টিকস খাতে ২, পর্যটন শিল্পে ২, অতিক্ষুদ্র শিল্পে ২ এবং কুটির শিল্পে ২ জনকে সিআইপি করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় কর ও রাজস্ব পরিশোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদনের আগের অর্থবছরে যথাযথভাবে শুল্ক, ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ না করলে কোনো উদ্যোক্তা সিআইপি হওয়ার যোগ্য হবেন না। ঋণখেলাপিরাও এই মর্যাদার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের শিল্প বিরোধ, নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধে সাজা, শেয়ার-সংক্রান্ত অনিয়মসহ বিভিন্ন কারণে আবেদন অযোগ্য হতে পারে।
আবেদনপত্রে মিথ্যা বা অসত্য তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরবর্তী তিন বছর সিআইপি হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। একবার সিআইপি নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী দুই বছর একই ব্যক্তি আবার সিআইপি হতে পারবেন না।
এ ছাড়া আবেদনের আগের পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাজস্ব ফাঁকির কারণে সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের জরিমানা পেয়ে থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক, উদ্যোক্তা পরিচালক বা চেয়ারম্যানও সিআইপি নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হবেন।
নতুন নীতিমালায় শুধু উদ্যোক্তার দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রাথমিক বাছাই কমিটি একটি খসড়া তালিকা তৈরি করবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হবে।
অর্থাৎ উদ্যোক্তা আবেদনে যে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর পরিশোধ বা ঋণ পরিস্থিতির তথ্য দেবেন, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বছর ১৫ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিআইপি (শিল্প) হওয়ার আবেদন গ্রহণ করা হবে। এরপর শুরু হবে যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।
প্রাথমিক বাছাই কমিটির পর চূড়ান্ত মূল্যায়ন কমিটি স্কোরের ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করবে। ফলে শুধু নীতিমালার যোগ্যতা পূরণ করলেই সিআইপি হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না; প্রতিযোগিতার মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করতে হবে।
সিআইপি মর্যাদা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয়, এর সঙ্গে বিভিন্ন সুবিধাও রয়েছে। সিআইপি নির্বাচিত ব্যক্তি এক বছরের জন্য পরিচয়পত্র পান, যা সচিবালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রবেশপত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
জাতীয় অনুষ্ঠান এবং সিটি করপোরেশনের নাগরিক সংবর্ধনায় আমন্ত্রণ পাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কাজে আকাশ, রেল, সড়ক ও নৌপথে সরকারি পরিবহনে আসন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।
বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসা পাওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে চিঠি দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। সিআইপি এবং তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেবিন পাওয়ার অগ্রাধিকার রয়েছে। বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ-২ ব্যবহারের সুবিধাও পাওয়া যায়।
তবে এসব সুবিধা স্থায়ী নয়। কোনো সিআইপি পরবর্তীতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বা নির্দিষ্ট ধরনের আর্থিক, আইনগত কিংবা নিয়ন্ত্রক অনিয়মে জড়িয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তার মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিআইপি (শিল্প) ছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সিআইপি (রফতানি) ও সিআইপি (বাণিজ্য) মর্যাদা দিয়ে থাকে।
রফতানি খাতের উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে রফতানি কর্মক্ষমতা, কর পরিশোধ এবং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর বাইরে এফবিসিসিআইয়ের পদাধিকারী পরিচালকদের মধ্য থেকেও সিআইপি (বাণিজ্য) দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, স্কোরভিত্তিক এবং বিভিন্ন সূচকের সমন্বয়ে সিআইপি নির্বাচন করা হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, শুধু একটি সূচক, বিশেষ করে রফতানির পরিমাণ দিয়ে একজন উদ্যোক্তার অবদান মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ বেশি রফতানি করলেই কোনো উদ্যোক্তা বেশি ভালো করছেন—বিষয়টি সব সময় এমন নয়। কেউ লোকসান দিয়েও বেশি রফতানি করতে পারেন। তাই একজন উদ্যোক্তার সামগ্রিক অবদান বিবেচনা করা জরুরি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনও নতুন নীতিমালাকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, আগে বড় ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের আকার বেশি গুরুত্ব পেত। এখন উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর ও ভ্যাট প্রদান, কর্মসংস্থান, রফতানি, স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, পরিবেশ রক্ষা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের মতো বিষয় বিবেচনা করা হবে। এতে অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখা উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তার মতে, বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি মাঝারি, ক্ষুদ্র, মাইক্রো ও কুটিরশিল্প এবং প্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও পর্যটন খাতকে সুযোগ দেওয়াও ইতিবাচক। তবে ছোট প্রতিষ্ঠান, নারী উদ্যোক্তা এবং ঢাকার বাইরের উদ্যোক্তারা যেন বাস্তবে পিছিয়ে না পড়েন, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে নতুন নীতিমালা সিআইপি নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখন শুধু বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি হলেই হবে না; উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর প্রদান, কর্মসংস্থান, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং উদ্ভাবনের মতো বাস্তব অবদানই নির্ধারণ করবে কে সিআইপি মর্যাদা পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন।
You cannot copy content of this page