সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশকে যুক্ত করার একটি প্রস্তাব তুর্কি গণমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশকে এই জোটে যুক্ত করার বিষয়টি এখনো একটি সম্ভাব্য বা কাল্পনিক প্রস্তাব হিসেবেই আলোচিত হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, তুরস্কের এমন উদ্যোগ ভারতের সামরিক ও কৌশলগত হিসাবের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ঢাকার সঙ্গে আঙ্কারার সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনডিটিভির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অদিতি ভাদুড়ির লেখা নিবন্ধে তুরস্কের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ইয়েনি শাফাক’-এর একটি বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্কের উদীয়মান প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশ যুক্ত হলে দেশটি ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক অসমতা কমিয়ে আরও স্বাধীন ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোতে পারে।
‘ইয়েনি শাফাক’-এর বিশ্লেষণে সম্ভাব্য এই জোটকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কূটনীতির জন্য একটি নতুন সুযোগ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে এতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
তবে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির কার্যক্রম রয়েছে এবং দুই দেশ নিয়মিত সামরিক সহযোগিতা ও মহড়ায় অংশ নেয়। ফলে সৌদি আরব নতুন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোর কারণে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক কতটা প্রভাবিত হতে দেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অন্যদিকে, ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতার কথা এনডিটিভির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ ও বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তিতে তুরস্ক উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও দেশটির প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
‘ইয়েনি শাফাক’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এই সম্ভাব্য কাঠামোয় যুক্ত হলে তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে নৌবাহিনী আধুনিকায়ন, ড্রোন প্রযুক্তি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ বর্তমানে চীন, ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। ফলে কোনো নতুন প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
‘ইয়েনি শাফাক’-এর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে আগ্রাসী পদক্ষেপের পরিবর্তে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরির একটি কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশকে এই জোটে যুক্ত করার বিষয়টি এখনো কোনো বাস্তব সিদ্ধান্ত নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাই বিষয়টিকে আপাতত তুর্কি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপট হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি তুরস্ক, সৌদি আরব বা পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির কারণে দেশটির আঞ্চলিক গুরুত্বও বাড়তে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি ও ইয়েনি শাফাক
You cannot copy content of this page