ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে চলতি বছরের প্রথমার্ধে ৯৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ৯৪ শতাংশ। গত এক দশকে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন ১৪৬ শতাংশ বাড়লেও ইউরোপে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
ইইউএএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৯০১টিতে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আবেদন জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৫২১টি।
গত এক দশকে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদনের সংখ্যা ওঠানামা করেছে। করোনা মহামারির বিধিনিষেধের কারণে ২০২০ সালে আবেদন কমে ১১ হাজার ৫৭০টিতে নেমে আসে। পরে আবার বাড়তে থাকে। ২০২৩ সালে আবেদন জমা পড়ে ৪০ হাজার ৩৩২টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ২৩৬টিতে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে ইউরোপে সামগ্রিক আশ্রয়ের আবেদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশিদের আবেদনও কিছুটা কমে আসে। ওই বছর ইইউ প্লাস দেশগুলোতে আশ্রয়প্রার্থীদের উৎস দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ।
ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের পছন্দের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশিদের কাছে ইতালি সবচেয়ে জনপ্রিয়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর দেশটি বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ফ্রান্স। ২০২৫ সালে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে গ্রিস।
এদিকে আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তির গতিও বাড়িয়েছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়, যা ওই বছরের নতুন আবেদনের সংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা ২০২৪ সালের ৪৭ হাজার ৭৭৮ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৪১ হাজার ৬৯২টিতে দাঁড়ায়।
তবে ২০২৫ সালে ইইউ প্লাস দেশগুলোতে সামগ্রিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুরের গড় হার ছিল ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, কৃষি খাতে আয় কমে যাওয়া, বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগের সংকট এবং মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা অনিয়মিত অভিবাসন বাড়াচ্ছে। ইউরোপে পৌঁছালেই আশ্রয় পাওয়া যাবে—এমন ধারণা ছড়িয়ে দিয়ে পাচারকারীরা মানুষকে বিপজ্জনক যাত্রায় প্রলুব্ধ করছে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, কর্মসংস্থানের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি খাতে আয় কমে যাওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানব পাচারকারী চক্রের বিস্তারের কারণে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, মাদারীপুরে ওকাপের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের সমীক্ষায় ৬৯৯টি খানার মধ্যে ৪০২টি থেকে লিবিয়া হয়ে প্রধানত ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনিয়মিত অভিবাসনের তথ্য পাওয়া গেছে।
শাকিরুল ইসলামের মতে, গ্রাম থেকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পর্যন্ত সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এ নেটওয়ার্কের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা জড়িত এবং লিবিয়া অংশে স্থানীয় মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস’ (টিআইপি) প্রতিবেদনেও। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে আগের মতোই ‘টিয়ার-২’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। গত সাত বছর ধরে এ অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
প্রতিবেদনে মানব পাচারসংক্রান্ত তদন্ত ও বিচার বৃদ্ধি এবং নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়নসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিচারপ্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, অনিয়মিত অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যানের পরিণতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেকে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিপীড়ন বা সমকামিতার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে ভুয়া কারণ ও মিথ্যা নথিপত্রের মাধ্যমে আশ্রয়ের আবেদন করা হচ্ছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশে বাংলাদেশের মিশন ও দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো, ভুয়া আবেদনের আইনি পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং স্বরাষ্ট্র, পাসপোর্ট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন পথ ও মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন আসিফ মুনীর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপযাত্রা বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থীদের সঠিক তথ্য জানানো এবং প্রকৃত সুরক্ষাপ্রার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
You cannot copy content of this page