সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ আশাশুনিতে জাইকার অর্থায়নে চলমান টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে সিডিউলবহির্ভূত কাজ, নিম্নমানের সিসি ব্লক তৈরি, প্যাকেজ পরিবর্তন এবং সরকারি নথিতে ব্যাকডেট দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়ম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে কোটি কোটি টাকা লোপাটের আশঙ্কার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বাঁধ নির্মাণের জন্য সিসি ব্লক তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী কাস্টিংয়ের ২৪ ঘণ্টা পর ফর্মা খোলার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফর্মা খুলে ফেলা হচ্ছে। পরদিনই অপরিপক্ব ব্লক মাটি থেকে তুলে এনে সারিবদ্ধভাবে রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সময় কিউরিং না করায় এসব ব্লকের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্লকের তারিখ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ২৭ আগস্ট তৈরি করা কিছু ব্লকে জুন ২০২৬-এর তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৃত কাজের সময় গোপন করে আগের অর্থবছরের অগ্রগতি দেখানো এবং বিল উত্তোলনের উদ্দেশ্যেই এভাবে ব্যাকডেট দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপ-বিভাগের আওতাধীন জাইকার চারটি প্যাকেজের মধ্যে ২ নম্বর প্যাকেজের (হাজরাখালি) কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে ওই প্যাকেজের কাজের কিছু অংশ ৩ ও ৪ নম্বর প্যাকেজের (কোলা এলাকা) আওতায় অন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কর্ম এলাকায় উপস্থিত কর্মচারীদের কাছে কাজ স্থানান্তরের লিখিত ‘অফিস অর্ডার’ কিংবা প্যাকেজ বাতিলের ‘ক্যানসেলেশন পেপার’ দেখতে চাইলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে তা দেখাতে পারেননি। ফলে নিয়ম মেনে কাজ স্থানান্তর করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের এসব কাজের বিষয়ে পিডি আরিফুজ্জামানের নির্দেশনা এবং সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলাম ও শাখা কর্মকর্তা আব্দুল আলিমের সহায়তার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রকল্প এলাকায় জাইকা বা পাউবোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকি না থাকার অভিযোগও রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, পর্যাপ্ত তদারকির অভাবেই ঠিকাদাররা নির্মাণকাজে অনিয়মের সুযোগ পাচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, আশাশুনি অত্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকা। বাঁধ নির্মাণে নিম্নমানের ব্লক ব্যবহার কিংবা নির্মাণকাজে অনিয়ম হলে জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় বা অতিরিক্ত পানির চাপে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে মানুষের জানমাল, ঘরবাড়ি ও কৃষি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
এ অবস্থায় প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা, কাজের পরিমাণ ও সিডিউল যাচাই এবং পুরো প্রকল্পের কারিগরি অডিটসহ দ্রুত সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
You cannot copy content of this page