ইরানের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর নাবিকদের মানসিক চাপ ও জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নাবিকদের পরিবার, কংগ্রেস সদস্য ও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম নেভি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে, দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থানের কারণে রণতরীর কয়েকজন নাবিক গুরুতর মানসিক চাপে পড়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রণতরীটি প্রায় ৯ মাস ধরে সমুদ্রে রয়েছে। এর মধ্যে টানা ২৫০ দিনেরও বেশি সময় তীরে না ভিড়ে সমুদ্রে অবস্থান করেছে, যা আধুনিক সময়ে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জন্য রেকর্ড বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার পাশাপাশি রণতরীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। নাবিকদের পরিবারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি, নষ্ট বাথরুম, শাওয়ারে ছত্রাক, গরম পানির সংকট এবং লন্ড্রি ব্যবস্থার সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
কিছুদিন আগে রণতরীর লন্ড্রি বিভাগে আগুন লাগার ঘটনায় প্রায় ৬০০ নাবিক তাদের ঘুমানোর বাঙ্ক হারান বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতির অভিযোগও এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার সান ডিয়েগোতে মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রায় ২০০ নাবিকের পরিবারের সদস্য তাদের উদ্বেগের কথা জানান।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন অভিযোগ করেন, রণতরীতে গোসলখানা ও শৌচাগার নষ্ট, লন্ড্রি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন অচল, গরম পানির সংকট এবং খাবারের ঘাটতি রয়েছে।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো বলেন, আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। তিনি নিজেও সাবেক সেনা রেঞ্জার এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করে। প্রথমে দক্ষিণ চীন সাগরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরে এটিকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রণতরীটির মোতায়েনের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ হাজারের বেশি সদস্যের এই ক্রুরা দীর্ঘ সময়ে মাত্র দুই দিন তীরে কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন—ডিসেম্বরে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে।
এর আগে এপ্রিলেও রণতরীটির জীবনযাত্রার পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। তখন খাবারের মান ও পরিমাণ, পানির সংকট, নষ্ট লন্ড্রি মেশিন ও গোসলখানা নিয়ে নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সে সময় এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ান-কে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র মোতায়েন নাবিক ও তাদের পরিবারের ওপর গুরুতর চাপ তৈরি করতে পারে। তবে নাবিকদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নৌবাহিনীর অগ্রাধিকার।
রণতরীতে চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ধর্মীয় কর্মকর্তা এবং কাউন্সেলর রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নৌবাহিনীর দাবি, রণতরীতে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে নাবিকদের মধ্যে আত্মহানির চিন্তা বা এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে—এমন কোনো তথ্য তাদের হাতে নেই বলেও জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী।
You cannot copy content of this page