ভারতে সরকার পরিবর্তনের দাবিতে চলমান বিক্ষোভকে ‘দেশবিরোধী’ কিংবা বিদেশি অর্থায়নে সরকার উৎখাতের চেষ্টা হিসেবে দেখানোর অভিযোগের জবাব দিয়েছেন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুর। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেশটিতে জারি থাকা জরুরি অবস্থার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তখন ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটেছিল।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন থারুর। ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বক্তব্যের জবাবে তিনি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরেন।
থারুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই জরুরি অবস্থা এবং এর অবসানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই সময় সরকার কীভাবে পরাজিত হয়েছিল, সেটিও মনে রাখা প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘ, সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থীরা একত্র হয়ে জরুরি অবস্থা জারি করা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন।
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে থারুর বলেন, এটি ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেরই অংশ, যা ঘটেছে মাত্র অর্ধশতাব্দী আগে।
ফ্রান্সের চলমান সহিংস বিক্ষোভের মতো পরিস্থিতি ভারতে তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও নাকচ করেন থারুর। তিনি বলেন, ভারতের সংবিধান ও আইন নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার দিয়েছে। তবে সহিংসতার কোনো সুযোগ নেই।
থারুরের ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, এ বিষয়ে সংবিধান ও আইন খুব স্পষ্ট। প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে, কিন্তু সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়।’
ফ্রান্সের সহিংস বিক্ষোভ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে কেউই এমন পরিস্থিতিকে সমর্থন করবেন বলে তিনি মনে করেন না। তিনি নিজেও সহিংসতার পক্ষে নন এবং তাঁর দলও এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না।
বর্তমান আন্দোলনের কয়েকজন নেতা—অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা এবং আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য প্রসঙ্গে থারুর বলেন, কংগ্রেস শান্তিপূর্ণ, সংগঠিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাস করে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে কোনো নাগরিক যেন ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
থারুরের মতে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তন হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এখানে লক্ষ্য ‘সরকার উৎখাত’ নয়, বরং জনগণের ভোটে ‘সরকার পরিবর্তন’। বর্তমান সরকারের সীমাবদ্ধতা জনগণ দেখেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, কংগ্রেস নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিবর্তন আনতে চায়।
কেরালাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও আন্দোলনের ক্ষেত্রে তাদের একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় থারুরকে। জবাবে তিনি আইসা সভাপতি নেহা বোরার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
থারুর বলেন, এসব দলের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। নেহা বোরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছিলেন না; বরং আন্দোলনে নতুন উদ্যম, বৈচিত্র্য ও প্রাণচাঞ্চল্য এনেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি কংগ্রেসের মধ্যপন্থী অবস্থান, ভিন্নমতকে গ্রহণ করা এবং বিরোধী দলগুলোর ঐক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ প্রসঙ্গে ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরেন তিনি। জরুরি অবস্থার অবসানের পর কংগ্রেসের বিদ্রোহী অংশ, জনসংঘ, সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে জনতা পার্টি গঠিত হয়। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার পরাজিত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে জনতা পার্টির ঐক্য ভেঙে যায় এবং ১৯৮০ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন ইন্দিরা গান্ধী।
সূত্র: এনডিটিভি
You cannot copy content of this page