কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ে তিনজনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। মরদেহ উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ নিহত হওয়ার ঘটনার পর পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানা ঘিরে অভিযান চালাচ্ছিল যৌথ বাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অভিযানে বিজিবি ও পুলিশের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক দল অভিযান পরিচালনা করছে।
অভিযানের সময় হ্নীলা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় যৌথ বাহিনী। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পাহাড়ে তিনজনের মরদেহ থাকার খবর পাওয়া গেছে। মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে এবং ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সেনাসদস্য তিতাস শেখ হত্যার প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে টেকনাফ ও উখিয়ায় মিছিল-সমাবেশ করেছে বিএনপি। একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন টেকনাফের সাধারণ ছাত্র-জনতা। পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত রেখে এলাকাকে অপরাধমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সেনাসদস্য তিতাসের মরদেহ পৌঁছেছে গ্রামের বাড়িতে
নিহত সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখের মরদেহ হেলিকপ্টারে করে তাঁর গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়ায় নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার আসরের নামাজের পর রামু সেনানিবাসে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারটি গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। সন্ধ্যার আগেই মরদেহ লস্করদিয়ায় পৌঁছায়।
এর আগে শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে তিতাসের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় রামু সেনানিবাসে। নিহত তিতাস ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে।
বৃহস্পতিবার টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলিতে তিনি নিহত হন।
৫৬ জিম্মি উদ্ধার, আটক ছয় পাচারকারী পুলিশের হেফাজতে
শুক্রবার দুপুরে পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে টেকনাফ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই ঘটনায় অস্ত্রসহ আটক ছয় মানবপাচারকারীকেও পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, মানবপাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পরে আদালতের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে তাঁদের হস্তান্তর করা হবে। এ ছাড়া সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
ওসি আরও জানান, এর আগে ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। তবে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে একজন দালাল ছিলেন।
আট দিন ঝুপড়িতে বন্দি, পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ
উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, মানবপাচারকারীরা তাঁকে আট দিন ধরে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি। তাঁর দাবি, পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।
আসাদুজ্জামান বলেন, কক্সবাজারের একটি সেতুতে কাজ করার সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের ইমামুল নামে এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। তাঁর মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়ার পর রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পাহাড়ে গিয়ে তিনি নিজের মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে বন্দি অবস্থায় দেখতে পান। তখন বুঝতে পারেন, তিনি মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
তিনি আরও জানান, দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাঁকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তাঁদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর জানান, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাঁদের মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য, পাঁচ দিন ধরে তাঁরা সেখানে ছিলেন। এ সময় প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে জড়ো করা হতো। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় তাঁরাও মারধরের শিকার হন। পরে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
তাঁরা আরও জানান, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। গতকাল তাঁদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি স্থানীয়দের
হ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালানো প্রয়োজন। তা না হলে মানবপাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। তাঁর দাবি, প্রতিদিন পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে সশস্ত্র অপরাধীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অপরাধীদের কাছে স্থানীয় বাসিন্দারা অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে তিনি পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানান।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও প্রশাসন খোঁজখবর রাখছে।
তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
You cannot copy content of this page