কৃষিপণ্যের বীজ কিনে মৌসুমি ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে রাজশাহীর পথে রওনা হয়েছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সাত ব্যবসায়ী। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তাঁদের পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন সঙ্গে থাকা অন্য দুই ব্যবসায়ী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন। নিহতদের মধ্যে আট বছরের শিশু তাছফিয়া খাতুনও রয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, স্ত্রী-সন্তানের ভরসা এবং জীবিকার প্রয়োজনে পথে নামা মানুষও। স্বজনদের আহাজারিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে একাধিক এলাকায়।
নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও বড়াইগ্রাম থানা সূত্রে জানা যায়, বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস ভোর ৪টার দিকে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নয়জন নিহত হন। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত নয়জনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা হলেন ট্রাকচালক রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার আবুল কালাম আজাদ (৩২), বাসের সুপারভাইজার সোহেল রানা (৩৬), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লা (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহীন হোসেন (২৫), রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কোনোপাড়া গ্রামের আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের শহিদুল ইসলাম (৪০) এবং তাঁর আট বছরের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন।
আহতদের মধ্যে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা আক্তার বনপাড়া পাটোয়ারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রমজান আলী (২৮), দিনাজপুরের ইয়াকুব আলী (৩৪) ও চাঁদপুরের আব্দুস সালাম (২২)। অন্য আহতদের নাটোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত সাত থেকে আটজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।
দুর্ঘটনার পর বাসের চালকের আসনে সুপারভাইজার ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন যাত্রী। তাঁদের দাবি, বাসের মূল চালক ও তাঁর সহকারী পেছনের আসনে বসে ছিলেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যাত্রী রমজান আলী বলেন, তিনি চালকের দুই আসন পেছনে বসেছিলেন। বাসটি ঈশ্বরদী পৌঁছানোর পর চালক ও তাঁর সহকারী পেছনে গিয়ে বসেন। এরপর বাসের সুপারভাইজার চালকের আসনে বসে গাড়ি চালাতে শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর দুর্ঘটনাটি ঘটে।
বাসের আরও দুই যাত্রী ইয়াকুব আলী ও আব্দুস সালামও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটি সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বরগুনা জেলা শহর থেকে ছেড়ে আসে। ঈশ্বরদীতে কিছু সময় বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হলে সুপারভাইজার চালকের আসনে বসেন। এর কিছু সময় পরই দুর্ঘটনা ঘটে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি।
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ীর বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায়। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কাজীরহাট বাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করতেন। রবিশস্য ও কৃষিপণ্যের মৌসুম সামনে রেখে বীজসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন তাঁরা।
সোমবার সন্ধ্যায় কাজীরহাট বাজার থেকে একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেন সাত ব্যবসায়ী। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল রাজশাহী থেকে কৃষিপণ্যের বীজ সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হয় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।
নিহতদের মধ্যে জুয়েল মাদবর রবিশস্য কেনাবেচার পাশাপাশি কাজীরহাট বাজারে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ছিলেন রবিশস্য ব্যবসায়ী। শাহিন ব্যাপারি হলুদ কেনাবেচা করতেন। আর সালাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদার পেঁয়াজ ও রসুনের বীজের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জুয়েল মাদবরের ভগ্নিপতি বাদল জমাদ্দার বলেন, জুয়েলের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। তিন ভাই কাজীরহাট বাজারে ব্যবসা করেন। ভুট্টার বীজ ও ভুট্টা আনতে রাজশাহী যাচ্ছিলেন জুয়েল। স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানকে বাড়িতে রেখে সোমবার বিকেলে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি।
বাদল জমাদ্দার বলেন, মঙ্গলবার সকালে জুয়েলের মৃত্যুর খবর পান তাঁরা। এভাবে দুর্ঘটনায় তাঁর প্রাণ যাবে, তা তাঁরা কখনো ভাবেননি।
কাজীরহাট বণিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম জানান, নিহত ব্যবসায়ীদের মরদেহ আনতে তাঁরা নাটোরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। আহত ব্যবসায়ীদের স্বজনেরা তাঁদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে রাজশাহীতে গেছেন।
বড়কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর খলিফা বলেন, দুর্ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যা বা রাতে মরদেহগুলো এলাকায় পৌঁছাতে পারে। এরপর ব্যবসায়ীদের মরদেহ কাজীরহাট বাজারে নেওয়া হবে। সেখানে একসঙ্গে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
You cannot copy content of this page