সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসকে মধ্যস্থতার (মেডিয়েশন) মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার মো. ইমতিয়াজুল ইসলাম।
সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আল ইমরান খান স্বাক্ষরিত ওই সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সাতটি আইনের আওতাভুক্ত মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), বিশেষ করে মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।
আইনগুলো হলো—পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩; পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩; যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০; দণ্ডবিধি, ১৮৬০; সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এবং নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১।
চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার মো. ইমতিয়াজুল ইসলাম জানান, লিগ্যাল এইডে ‘প্রি-কেস’ ও ‘পোস্ট-কেস’—এই দুই ধরনের মধ্যস্থতা হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে বর্তমানে শুধু মামলা দায়েরের পরের ‘পোস্ট-কেস’ মধ্যস্থতার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুতর বা কগনিজেবল অপরাধ এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে না। মূলত পারিবারিক বিরোধ, সাধারণ মারামারি এবং অন্যান্য ছোটখাটো মামলায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সার্কুলার অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ৫ ধারার আওতায় বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, খোরপোষ এবং শিশুসন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত-সংক্রান্ত মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা যাবে।
ইমতিয়াজ বলেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে একটি সংসার টিকে গেলে সেটি ইতিবাচক ফল। দুই পক্ষকে বসিয়ে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার পাশাপাশি দেনমোহর বা অন্যান্য পাওনা অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রেও সমঝোতার চেষ্টা করা যেতে পারে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এর ৫ ধারার মামলাও মধ্যস্থতার আওতায় রাখা হয়েছে। কোনো সন্তান বাবা-মায়ের দেখভাল না করলে বাবা বা মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। এমন মামলা আপিল বা রিভিশনে হাইকোর্টে এলে আদালত চাইলে তা লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতার জন্য পাঠাতে পারবেন।
তিনি বলেন, দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে লিগ্যাল এইড অফিস আদালতে একটি প্রতিবেদন পাঠাবে। লিগ্যাল এইড অফিস নিজে কোনো মামলা নিষ্পত্তি করবে না; আপস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার পর আদালত আইন অনুযায়ী মামলাটি নিষ্পত্তি করবে।
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ) ধারার মামলাও মধ্যস্থতার আওতায় রাখা হয়েছে। তবে হত্যা, ধর্ষণ বা দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারার মতো গুরুতর ও আপস-অযোগ্য অপরাধ এ ব্যবস্থার আওতায় থাকবে না।
দণ্ডবিধির আওতায় বেআইনি সমাবেশ, অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ, গৃহে অনধিকার প্রবেশ, স্বেচ্ছায় আঘাত করা, বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে আঘাত, গুরুতর আঘাত, চুরি, প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, মানহানি এবং কয়েকটি অন্যান্য অপরাধের মামলাও নির্ধারিত শর্তে মধ্যস্থতার আওতায় নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর আওতায় সম্পত্তির দখল ফিরে পাওয়া, চুক্তির সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন, দলিল বাতিল, মালিকানা বা অধিকার সম্পর্কে ঘোষণামূলক ডিক্রি এবং নিষেধাজ্ঞার মামলাও মধ্যস্থতার সুযোগ পাবে।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনারের মামলাও এ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে কোনো মামলায় একাধিক ধারা থাকলে পুরো মামলাটি মধ্যস্থতার আওতায় আসবে কি না, তা মামলার সামগ্রিক প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান ও সার্কুলারে নির্ধারিত শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলার সময় ও খরচ দুটোই কমবে। আদালতে কোনো মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলেও লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতায় এক থেকে দুই মাসের মধ্যে বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্য রয়েছে। এ সেবার জন্য কোনো ফি দিতে হবে না।
তার মতে, আদালতের রায়ে সাধারণত একটি পক্ষ জয়ী এবং অন্য পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতা হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিরোধের সমাধান সম্ভব, যা একটি ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ তৈরি করতে পারে।
You cannot copy content of this page