নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিতে অর্থ লেনদেনসহ গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অনুসন্ধান শুরুর পরও তাঁর রাজনৈতিক জোট ১১ দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সম্মিলিত অবস্থান দেখা যায়নি। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এ জন্য উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। একই অভিযোগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জুবায়ের হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চলছে।
দুদকের অনুসন্ধানে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন পদায়নের আদেশ দেওয়ার বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দরপত্র ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। দুদকের অনুসন্ধানেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও নথি চেয়েছে দুদক। ৩ সেপ্টেম্বর পাঠানো চিঠিতে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য ও রেকর্ডপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র, বদলি-সংক্রান্ত বিভিন্ন স্মারকের নথি, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব প্রদান ও বাতিল এবং পদায়ন-সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথিও চেয়েছে অনুসন্ধান দল।
এদিকে আসিফ মাহমুদ দুদকের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে দুদকের এক কর্মকর্তার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বক্তব্য পরে ‘স্লিপ অব টাং’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।
আসিফ মাহমুদ বর্তমানে এনসিপির মুখপাত্র। দলটি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের অন্যতম শরিক। ফলে জোটের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলেও কেন জোট প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নিচ্ছে না—এ প্রশ্ন উঠেছে।
তবে ১১ দলের কয়েকটি শরিক দলের নেতাদের বক্তব্যে অনুসন্ধান নিয়ে সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে।
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, অনুসন্ধান নিরপেক্ষভাবে হওয়া উচিত এবং সত্যতা পাওয়া গেলে তা জনসম্মুখে আসা দরকার।
তিনি আরও বলেন, ১১ দল এনসিপির সঙ্গে জোট করেছে, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নয়। আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় এনসিপি নেবে কি না, সেটি দলটির নিজস্ব বিষয়। প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের জন্য তাকেই জবাবদিহি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও অনুসন্ধানের আগে দুদকের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, আসিফ মাহমুদ অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন বলেছেন। অন্যদিকে দুদকের একজন কর্মকর্তা প্রথমে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলে পরে সেটিকে ‘স্লিপ অব টাং’ বলেছেন। এতে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
মঞ্জু বলেন, যেকোনো অভিযোগের সুষ্ঠু, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দুদক যেন অতীতের মতো দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান দুদকের অনুসন্ধানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাঁরও দাবি, অনুসন্ধান যেন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য না হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেও মত দেন তিনি।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের স্বার্থে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, ১১ দলীয় জোটের শরিকদের বক্তব্যে আপাতত একটি অভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে—দুদকের অনুসন্ধান বন্ধের দাবি কেউ তুলছেন না, আবার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আসিফ মাহমুদকে দোষীও মনে করছেন না। বরং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোটের কোনো শরিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার পর সরাসরি তার পক্ষে অবস্থান নিলে তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠতে পারে। আবার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বিরোধিতায় গেলেও তা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই আপাতত নীরব থেকে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাকেই জোটের শরিকরা নিরাপদ কৌশল হিসেবে দেখছেন।
এখন মূল প্রশ্ন, দুদকের চাওয়া নথি ও অনুসন্ধানে কী তথ্য বেরিয়ে আসে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনুসন্ধানের অভিযোগের কী ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—সেদিকেই নজর থাকবে।
You cannot copy content of this page