দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন আস্থা ও তারল্য সংকটে পড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। বিতর্কিত চেয়ারম্যান অপসারণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিল—এই চারটি পদক্ষেপকে ব্যাংকটির সংকট উত্তরণে বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত ২৪ মে এস আলম গ্রুপের সুবিধাভোগী হিসেবে আলোচিত খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। এ নিয়োগের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ইসলামী ব্যাংকসংক্রান্ত বক্তব্যের পর। ওই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং অনেকে একসঙ্গে আমানত তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ব্যাংকটির তারল্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
একপর্যায়ে ইসলামী ব্যাংকের পে-অর্ডার অনেক ব্যাংক গ্রহণ বন্ধ করে দেয়, আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম আরটিজিএস কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন শাখায় বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এতে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতেই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
ব্যাংকারদের মতে, কোটি কোটি গ্রাহক, বিশাল আমানতভিত্তি এবং দেশের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কের কারণে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়ত।
সংকট গভীর হওয়ার পর দ্রুত হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে অপসারণ করা হয়। পরে পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে চেয়ারম্যান এবং আশরাফুল আলমকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
একইসঙ্গে তারল্য সংকট মোকাবিলায় ধারাবাহিকভাবে নগদ সহায়তা দিতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংককে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনা না করে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংককে প্রায় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংককে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে।
গভর্নরের ভাষ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম চার মাস কোনো ব্যাংককে সহায়তা দিতে হয়নি। তবে ইসলামী ব্যাংকের বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যাংকিং কোম্পানি এবং এটি ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আইনের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে।
যেখানে আগে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল, এখন অনেক শাখা থেকেই এক লাখ, দুই লাখ কিংবা তার বেশি অর্থ উত্তোলন করা যাচ্ছে। নতুন আমানতও বাড়ছে এবং অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। ফলে দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।
ব্যাংকারদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তদারকি ও তারল্য সহায়তার ফলেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
ইসলামী ব্যাংকসহ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচিত ছিল ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা। ওই ধারার মাধ্যমে আগের মালিকরা নির্দিষ্ট শর্তে আবার ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারতেন।
তবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার এই ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একীভূত হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিকরা আর ব্যাংকের মালিকানায় ফিরতে পারবেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে এস আলম গ্রুপের ব্যাংকিং খাতে পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে সাত দফা দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল বিতর্কিত চেয়ারম্যান অপসারণ, নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, এস আলমের প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা, ব্যাংক লুটের বিচার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, ১৮(ক) ধারা বাতিল এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
সংগঠনটির নেতারা বলছেন, চেয়ারম্যান অপসারণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ১৮(ক) ধারা বাতিল—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতা বরদাশত করা হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাংকটিতে দ্রুত সৎ, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ব্যাংকটির জন্য ইতিবাচক হলেও জনগণের পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত রাখতে হবে।
You cannot copy content of this page