প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইবার হামলা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা চলার মতো খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন নির্দেশনায় প্রত্যেকের জন্য তিন দিনের খাবার এবং নয় লিটার পানীয় জল সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে ‘বি রেডি’ বা ‘প্রস্তুত থাকুন’ শীর্ষক প্রচারাভিযান শুরু করেছে ব্রিটিশ সরকার। এর লক্ষ্য, বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে যেন মানুষ অন্তত তিন দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন।
ব্রিটিশ নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জার্ভিস বলেছেন, যাঁরা এই পরামর্শ অনুসরণ করতে সক্ষম, তাঁদের তা করা উচিত। জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, দৈনন্দিন জীবনে হঠাৎ জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহব্যবস্থা, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রাশিয়া কিংবা অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন শক্তির রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তাই এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, হাইব্রিড যুদ্ধ ও ‘গ্রে জোন’ হুমকির মতো পরিভাষা সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে না। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় মদদে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে এসব হুমকিকে বিবেচনা করে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্ট্রিটিংয়ের ভাষ্য, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও ভেবে দেখা প্রয়োজন, দৈনন্দিন জীবনে হঠাৎ সংকট দেখা দিলে তারা কতটা প্রস্তুত এবং কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে।
সরকারের নির্দেশনায় বাড়িতে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ব্যাটারিচালিত টর্চ, হ্যান্ড-ক্র্যাংক বা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন এফএম রেডিও, কম্বল ও নগদ অর্থ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিন দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পানীয় জলের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য প্রতিদিন তিন লিটার করে পানি সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রান্না ও ধোয়ামোছার মতো কাজে এর বাইরেও পানি প্রয়োজন হতে পারে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকার গত আগস্টেই নাগরিকদের টিনজাত খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এবার মন্ত্রিসভা কার্যালয়ের ‘বি রেডি’ প্রচারাভিযানে আরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ প্রচারের অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বেতারে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হবে।
বিদ্যুৎ বিপর্যয়, তীব্র ঝড় কিংবা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে অন্তত তিন দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর প্রস্তুতিকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে দেশটির সরকার।
ইউরোপের ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশেও নাগরিকদের এ ধরনের জরুরি প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এবার যুক্তরাজ্যও একই ধরনের উদ্যোগ জোরদার করছে।
সম্প্রতি দেশটিতে একাধিক শক্তিশালী ঝড়ের পর আসন্ন শীতকালীন ঝড়ের মৌসুম সামনে রেখে এই প্রচারাভিযান শুরু করেছেন মন্ত্রীরা। গত জানুয়ারিতে ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মাইল বেগে আঘাত হানা ‘ঝড় গুরেত্তি’র কারণে মিডল্যান্ডস, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও ওয়েলসের হাজার হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এ ছাড়া সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এর ফলে ২০২৭ সাল বিশ্বের উষ্ণতম বছরগুলোর একটি, এমনকি রেকর্ড উষ্ণ বছরও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ুর অনিশ্চয়তা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ওয়েবসাইটে ব্যবহৃত পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ৩২টি সরকারি ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫০ হাজার সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টারনেট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর আধুনিক সমাজের ব্যাপক নির্ভরশীলতার বিষয়টি সামনে এনে এসব ঘটনা জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
You cannot copy content of this page