নাগরিক সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও আধুনিক করতে আবেদনকারীর বাসায় সরাসরি পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার (হোম ডেলিভারি) উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন ও ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রচলিত স্টিকার ভিসার পরিবর্তে অনলাইন ভিসা সিস্টেম চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, আবেদনকারীদের সময়, যাতায়াত ও খরচ কমাতে পাসপোর্ট হোম ডেলিভারি চালুর প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার ইউরো (প্রায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা) ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯০ হাজার ইউরো (প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা) এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে অবশিষ্ট ৫ লাখ ৮০ হাজার ইউরো (প্রায় ৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা) ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নীতিগতভাবে ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের আগে প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট, নিরাপদ বিতরণব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, পাসপোর্ট একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় নথি। তাই হোম ডেলিভারি ব্যবস্থায় আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই, নিরাপদ হস্তান্তর এবং প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, হোম ডেলিভারি চালু হলে মানুষের সময় ও ভোগান্তি কমবে। তবে ভুল ব্যক্তির হাতে পাসপোর্ট যেন না যায়, সে জন্য শক্তিশালী পরিচয় যাচাই, নিরাপদ চেইন অব কাস্টডি এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, এটি একটি জনবান্ধব উদ্যোগ। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি জবাবদিহি, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইমিগ্রেশন ও ভিসা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বর্তমানে ব্যবহৃত স্টিকার ভিসার পরিবর্তে আধুনিক অনলাইন ভিসা সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রশাসনিক অনুমোদন এবং পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন ভিসা চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ভ্রমণকারীরা দ্রুত ও সহজে সেবা পাবেন, যা বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এছাড়া বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে দক্ষ জনবল নিয়োগের জন্য ১২১টি নতুন পদ সৃষ্টির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত পাসপোর্টবিহীন বাংলাদেশি নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফেরাতে সব দূতাবাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ই-ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর অভ্যন্তরীণ সেবা জোরদারে ১৪ জন সহকারী পরিচালক, ৫ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, ২ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামার এবং ৭ জন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
এছাড়া কুমিল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ওপর চাপ কমাতে কুমিল্লার গৌরীপুরে একটি নতুন পাসপোর্ট প্রসেসিং সেন্টার (এপিসি) স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে ভিসা ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের জন্য ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ কোটি টাকা আন্তঃখাত সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং অবশিষ্ট ৩ কোটি টাকা সেবা চার্জ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাত থেকে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, হোম ডেলিভারি, অনলাইন ভিসা, ই-ট্রাভেল পারমিট এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ—সব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে নাগরিক সেবার মান বাড়বে এবং দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের দিকে আরও এগিয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের ডেটা প্রোটেকশন নিশ্চিত করা হলে আধুনিকায়নের সুফল আরও কার্যকরভাবে পাওয়া সম্ভব।
You cannot copy content of this page