মানুষের মন বারবার বদলায়। পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতা ও নানা ঘটনার প্রভাবে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তাই অন্তরের যত্ন, নজরদারি, শিক্ষা, পরিশুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে ও প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)।
মানুষের হৃদয়ও খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) বলতেন, ‘আমি কারও ব্যাপারে ভালো বা মন্দ কিছু বলি না, যতক্ষণ না দেখি তার শেষ পরিণতি কী হয়। কারণ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আদমসন্তানের হৃদয় এমনভাবে বদলায়, যেমন ফুটন্ত হাঁড়ির পানি উল্টে-পাল্টে ওঠে।’ (মুসনাদে আহমদ)।
এক কবি বলেছেন, মানুষকে ‘ইনসান’ বলা হয়, কারণ সে ভুলে যায়। আর হৃদয়কে হৃদয় বলা হয়, কারণ এটি বারবার বদলায়।
শাহর ইবনে হাওশাব (রহ.) বলেন, তিনি উম্মে সালামা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে মুমিনদের মা, আল্লাহর রাসুল (সা.) আপনার ঘরে থাকলে সবচেয়ে বেশি কী দোয়া করতেন?’
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশি বেশি বলতেন, ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এত বেশি এই দোয়া কেন করেন?’
তিনি বলেন, ‘হে উম্মে সালামা, মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দৃঢ় রাখেন, আর যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করে দেন।’ (তিরমিজি : ৩৫২২)।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো গাফলত—অলসতা, উদাসীনতা ও অসচেতনতা। এটি এমন এক ব্যাধি, যা মানুষের জীবন নষ্ট করে, সময় অপচয় করে, কর্মশক্তি নিঃশেষ করে এবং ধীরে ধীরে হৃদয়কে কঠিন করে ফেলে।
গাফলত মানুষকে ভালো কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষ তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে যায়, আল্লাহর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং আল্লাহর সাক্ষাৎ ও হিসাবের দিনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া থেকে বিরত থাকে।
গাফলতের কারণে মানুষের সামর্থ্য নষ্ট হয়, সময় বরবাদ হয় এবং জীবন এমন কাজে ব্যয় হয়, যার কোনো প্রকৃত উপকার নেই। এটি মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, নেকির পথ থেকে বিচ্যুত করে এবং পাপের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার বহু নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল।’ (সুরা ইউনুস : ৯২)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। এরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্পর্কে অবগত, আর আখেরাত সম্বন্ধে এরা গাফিল। এরা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না?’ (সুরা রুম : ৬-৮)।
শয়তান মানুষকে একবারে বড় পাপের দিকে নিয়ে যায় না। বরং ধীরে ধীরে তাকে গাফলতের মধ্যে ফেলে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। প্রথমে সুন্নত ছেড়ে দিতে শেখায়, এরপর নফল ইবাদতে অলসতা তৈরি করে। একসময় ফরজ ইবাদতেও অবহেলা শুরু হয়। পরে মানুষ অপছন্দনীয় কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে হারাম কাজে জড়িয়ে যায়।
এমনকি ছোট ছোট গুনাহকেও মানুষ তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে। একসময় সেই ছোট গুনাহই তাকে বড় ও ধ্বংসাত্মক পাপের দিকে নিয়ে যায়।
তাই গাফলত থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনীত ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে সকালে ও সন্ধ্যায় স্মরণ করবে আর তুমি গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।’ (সুরা আরাফ : ২০৫)।
সুতরাং আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে হৃদয়কে জীবিত রাখতে হবে। গাফলত ও অন্তরের কঠোরতা থেকে বাঁচতে হবে এবং আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকতে হবে।
শয়তানের কুমন্ত্রণা মানুষের জীবনের একটি পরীক্ষা। ভুলে যাওয়া কিংবা অলসতা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি বারবার গাফলতের মধ্যে ডুবে থাকে এবং নিজের অবহেলা সংশোধনের চেষ্টা না করে, তখন তা বড় বিপদে পরিণত হয়।
কোনো মুমিন গাফলতের মধ্যে পড়ে গেলে তাকে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। তাওবা করতে হবে, শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং তার কুমন্ত্রণা প্রতিহত করতে হবে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে আল্লাহর শরণ নেবে; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। যারা তাকওয়ার অধিকারী হয় তাদেরকে শয়তান যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, আর তৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়।’ (সুরা আরাফ : ২০০-২০১)।
গাফিল মানুষ প্রায়ই ভাবে—তাওবা পরে করব, ইবাদত পরে করব, এখনো অনেক সময় আছে। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। দিন চলে যায়, বয়স বাড়ে এবং জীবনের সুযোগগুলো একে একে শেষ হয়ে যায়।
গাফলতের অন্যতম কারণ হলো আল্লাহর ভয় না থাকা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি না নেওয়া।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না ও পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট আর এতেই পরিতৃপ্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলি সম্পর্কে গাফিল। এদেরই আবাস দোজখ, এদের কৃতকর্মের জন্যে।’ (সুরা ইউনুস : ৭-৮)।
সময় নষ্ট করাও গাফলতের একটি বড় কারণ। অবসর সময়কে মূল্য না দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে কাটিয়ে দিলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়: সুস্থতা ও অবসর।’ (বোখারি : ৬৪১২)।
বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিনে কোনো বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—তার জীবন কোথায় কাটাল, তার যৌবন কোথায় শেষ করল।’ (তিরমিজি : ২৪১৬)।
মানুষ তার সঙ্গীদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। গাফিল ও উদাসীন মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন মেলামেশা করলে নিজের মধ্যেও সেই উদাসীনতা তৈরি হতে পারে।
আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন, ‘তুমি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখবে এদেরই সংসর্গে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে এদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে এদের হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। তুমি তার আনুগত্য করো না যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে।’ (সুরা কাহফ : ২৮)।
তাই এমন মানুষের সঙ্গ বেছে নেওয়া উচিত, যাদের সঙ্গে থাকলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে, ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং আখিরাতের কথা স্মরণ হয়।
বর্তমান সময়ে গাফলতের অন্যতম বড় দরজা হয়ে উঠেছে মোবাইল, বিভিন্ন ডিভাইস, টেলিভিশন ও স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার। মানুষ এসবের মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই বিভ্রান্তিকর বিষয়, অনর্থক বিনোদন কিংবা গুনাহের দৃশ্যে ডুবে থাকছে।
এর ফলে কুরআন পড়ার সময় হয় না, জ্ঞানচর্চার সুযোগ থাকে না, এমনকি একান্তে আল্লাহর কাছে কান্না করার সময়ও অনেকে বের করতে পারেন না।
আল্লাহতায়ালা সতর্ক করে বলেন, ‘মানুষের হিসেব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু এরা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। যখনই এদের কাছে এদের প্রতিপালকের কোনো নূতন উপদেশ আসে এরা তা শ্রবণ করে কৌতুকচ্ছলে, এদের অন্তর থাকে অমনোযোগী।’ (সুরা আম্বিয়া : ১-৩)।
গাফলত থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আল্লাহকে ভয় করা, আন্তরিকভাবে তাঁর দিকে ফিরে আসা, তাওবা করা, গুনাহ পরিত্যাগ করা, মানুষের হক আদায় করা এবং নিয়মিত দোয়া ও ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত নিজের কাজের হিসাব নেওয়াও জরুরি। মানুষকে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আজ আমি কী করলাম? কতটা সময় আল্লাহর স্মরণে কাটালাম? কোন কাজে সময় নষ্ট করলাম? কোন গুনাহ করেছি? কারও হক নষ্ট করেছি কি না?
বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর দুর্বল সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির পেছনে ছুটে বেড়ায় এবং আল্লাহর কাছে শুধু আশা করে।
তাই আল্লাহর বান্দাদের উচিত, আল্লাহর হিসাব নেওয়ার আগেই নিজেদের হিসাব নেওয়া। জীবনকে প্রতিদিন যাচাই করা। কারণ আজ নিজেকে হিসাবের আওতায় আনতে পারলে আগামীকালের হিসাব সহজ হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, জীবন সীমিত, সময় অমূল্য এবং মৃত্যুর পর আর ফিরে আসার সুযোগ নেই। তাই গাফলতকে প্রশ্রয় না দিয়ে এখনই আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে, হৃদয়কে জাগ্রত রাখতে হবে এবং সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, যেদিন প্রত্যেক মানুষকে তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াতে হবে।
You cannot copy content of this page