মাসে মাসে দাম সমন্বয়ের পরও গত পাঁচ বছরে দেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিভিন্ন সময়ে দাম বাড়ানো ও কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২১ সালের ৯৭৫ টাকা থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় উঠেছিল।
২০২১ সালের ১২ এপ্রিল দেশে প্রথমবার বেসরকারি পর্যায়ের এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তখন ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯৭৫ টাকা। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে দাম পরিবর্তনের ব্যবস্থা চালু হয়।
প্রথম বছরেই এলপিজির দামে বেশ কয়েকবার ওঠানামা দেখা যায়। ২০২১ সালের এপ্রিলের ৯৭৫ টাকা থেকে মে ও জুনে দাম কমে যথাক্রমে ৯০৬ ও ৮৪২ টাকায় নেমে আসে। এরপর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ দফা দাম বাড়ে। নভেম্বর শেষে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১৩ টাকা। পরে ডিসেম্বরে ৮৫ টাকা কমিয়ে তা ১ হাজার ২২৮ টাকা করা হয়।
২০২২ সালেও দাম বাড়ানো ও কমানোর ধারাবাহিকতা ছিল। ওই বছর সাত দফা দাম বাড়ানোর বিপরীতে পাঁচ দফা কমানো হয়। বছরের শেষ দিকে ডিসেম্বর মাসে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৭ টাকা। ২০২৩ সালে সাত দফা দাম বাড়ানোর বিপরীতে পাঁচ দফা কমানো হয়। বছরের শুরুতে ১ হাজার ২৩২ টাকা থাকা সিলিন্ডারের দাম ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০৪ টাকা। তবে ওই বছর সবচেয়ে কম দাম ছিল জুনে—৯৯৯ টাকা।
২০২৪ সালে সাত দফায় দাম বাড়ানো হয়। বছরের শুরুতে ১ হাজার ৪৩৩ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে দাম বেড়ে ১ হাজার ৪৭৪ এবং মার্চে ১ হাজার ৪৮২ টাকায় ওঠে। এরপর কয়েক দফা কমা-বাড়ার পর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৪৫৫ টাকা।
২০২৫ সালে দাম বাড়ানোর প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল। বছরজুড়ে দুই দফা দাম বাড়ানোর বিপরীতে একাধিকবার দাম কমানো হয়। নভেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম কমে ১ হাজার ২১৫ টাকায় নেমেছিল। ওই বছরের সর্বোচ্চ দাম ছিল ফেব্রুয়ারিতে—১ হাজার ৪৭৮ টাকা।
২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে এলপিজির দামে আবার বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৫৩ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে দাম বেড়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা হয়। পরে ভ্যাট পরিবর্তনের কারণে ১৫ টাকা কমে তা ১ হাজার ৩৪১ টাকায় নেমে আসে। মার্চে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়। প্রথম দফায় ৩৮৭ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৪০ টাকা।
অর্থাৎ ২০২১ সালের এপ্রিলে ৯৭৫ টাকা থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় ওঠায় পাঁচ বছরে নির্ধারিত দাম বেড়েছিল ৯৬৫ টাকা, যা প্রায় ৯৯ শতাংশ।
তবে এরপর আবার দাম কমানো হয়েছে। জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানোর পর আগস্টে এক দফায় ৭০ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে আরও ১৩ টাকা কমিয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা করা হয়েছে।
সমস্যা হলো, বিইআরসি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু বাজারে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম নেওয়ার খবরও এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে ২৮ সেপ্টেম্বর এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার। বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। বৈঠকে অপারেটররা দেশের সামগ্রিক সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং কোনো সার্বিক সংকট নেই বলে জানায়।
তবে একই সময়ে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জেলা প্রশাসকদের এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশ দেন। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কোথাও সংকটের অভিযোগ কেন উঠছে এবং কেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে, তা তথ্য-প্রমাণসহ জানাতে ডিসিদের বলা হয়েছে।
এর পরদিন ১ অক্টোবর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানায়, দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। সংগঠনটি জানায়, সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। একই সঙ্গে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি বা অবৈধভাবে মজুত করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, আমদানি স্বাভাবিক থাকার দাবি থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ সংকটের অভিযোগও এসেছে। কিছু ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকের বক্তব্য অনুযায়ী, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপের কারণে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে খুচরা দামে। ফলে সার্বিক আমদানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার দাবি এবং স্থানীয় বাজারে সিলিন্ডার না পাওয়া বা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ—দুই ধরনের চিত্রই সামনে এসেছে।
এলপিজির দামের পাশাপাশি বাজারে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না হওয়াই এখন বড় ভোক্তা-সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজার ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের ভিত্তিতে দাম সমন্বয় করলেও সেই দাম খুচরা বাজারে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে সরকারি নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
You cannot copy content of this page