রাজধানী থেকে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন হয়ে গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রতিনিয়ত গ্রেফতার হচ্ছেন এজেন্টরা এবং জব্দ হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) নম্বর। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু এজেন্ট গ্রেফতার করে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপও প্রয়োজন।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অনলাইন জুয়ার মূল শক্তি হচ্ছে এর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এসব প্ল্যাটফর্ম সচল থাকলে এক এজেন্টের জায়গায় আরেক এজেন্ট তৈরি হবে এবং প্রতারণার শিকার হতে থাকবেন সাধারণ মানুষ।
১৫ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছয়জন এজেন্টকে গ্রেফতার করে। এ সময় সাড়ে ৬ হাজারের বেশি এমএফএস এজেন্ট নম্বর জব্দ করা হয়।
রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও একই ধরনের অভিযান চলছে। ২২ জুলাই রাতে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার নওপাড়া গ্রাম থেকে র্যাব-১২ অনলাইন জুয়ার অভিযোগে আরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে।
র্যাব জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেফারেল লিংকের মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করছিলেন। অভিযান চালিয়ে একটি ল্যাপটপ, দুটি স্মার্টফোন, চারটি সিম কার্ড এবং নগদ অর্থ জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র্যাব। তার বিরুদ্ধে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধনের কাজ করেন এজেন্টরা। একজন এজেন্ট আবার বহু নতুন এজেন্ট তৈরি করতে পারেন। এভাবেই শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে এই নেটওয়ার্ক।
নতুন ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে অনেক প্ল্যাটফর্ম জমাকৃত অর্থের ওপর বিভিন্ন ধরনের বোনাসের প্রলোভন দেখায়। শুরুতে কিছু ব্যবহারকারী লাভের অভিজ্ঞতা পেলেও পরে অধিকাংশই বড় অঙ্কের অর্থ হারান বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাসেল সরকার বলেন, অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো শুরুতে ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জনের জন্য সীমিত পরিসরে জেতার সুযোগ তৈরি করে। পরে দীর্ঘমেয়াদে এমনভাবে পরিচালিত হয় যে অধিকাংশ খেলোয়াড় ক্ষতির মুখে পড়েন।
তার মতে, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে শুধু এজেন্ট গ্রেফতার যথেষ্ট নয়। এসব ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনে ব্যবহৃত আর্থিক চ্যানেলগুলোর ওপরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
রাজধানীর এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, পরিচিত একজনের পরামর্শে প্রথমে অল্প অর্থ দিয়ে অনলাইন বাজিতে অংশ নিয়ে লাভ করেছিলেন। পরে ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে গিয়ে ব্যবসার মূলধন হারান।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, শুরুতে কিছু অর্থ জিতলেও পরে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে তিনি জীবিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিরোধে উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত হলে তা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানানো হয়।
তিনি জানান, অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানি লন্ডারিং ও অন্যান্য অবৈধ আর্থিক কার্যক্রম প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত কাজ করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এজেন্টদের গ্রেফতারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধের বিষয়েও কাজ চলছে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তালেব বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রগুলোকেও শনাক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
You cannot copy content of this page