দেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব করতে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ২.০ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান।
কামরুজ্জামান বলেন, ২০০১ সালে সংস্কার কার্যক্রম হিসেবে যাত্রা শুরু করা সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বর্তমানে দেশের ডিজিটাল সুশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। এ খাতে সংস্কার কার্যক্রম এখনো চলমান।
তিনি জানান, ২০০৩ সালের সরকারি ক্রয় প্রবিধানের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার শুরু হয়। পরে ২০০৬ সালে সরকারি ক্রয় আইন এবং ২০০৮ সালে সরকারি ক্রয় বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে সরকারি ক্রয় বিধিমালা ও সরকারি ক্রয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটকে (সিপিটিইউ) একটি স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রূপান্তর করা হয়। এর ফলে সংস্থাটির দায়িত্ব ও কার্যপরিধিও বেড়েছে।
বিপিপিএ প্রধান বলেন, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ করবে।
তিনি জানান, গত দুই দশকে সরকারি ক্রয়ের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৩ সালে সরকারি ক্রয়ের বার্ষিক বাজার ছিল প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়ায়। বর্তমানে এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
জাতীয় বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি ক্রয়ের পরিমাণও আরও বাড়বে বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিপিপিএ সম্প্রতি তিনটি অংশীজন পরামর্শ কর্মশালার আয়োজন করেছে। এসব কর্মশালায় ই-জিপি ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ই-জিপির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বিপিপিএর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও ক্রয় বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে এসব কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সুপারিশ পাওয়া গেছে বলে জানান বিপিপিএ প্রধান।
টেকসই ক্রয়ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারি ক্রয়কে শুধু ব্যয় সাশ্রয়, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়নের নীতি অন্তর্ভুক্ত করা, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ুসহনশীল ক্রয়ব্যবস্থার প্রসার, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা, স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা দেওয়া, ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রগতি তুলে ধরে কামরুজ্জামান বলেন, ২০১০ সালে একটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গড়ে প্রায় ১০০ দিন লাগত। বর্তমানে তা কমে ৫৪ দিনে নেমে এসেছে।
ই-জিপি চালুর আগে মূল দরপত্রের মেয়াদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতো। বর্তমানে এ হার বেড়ে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এ ছাড়া চুক্তি প্রদানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে শতভাগে এবং দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের হার ২০ শতাংশ থেকে শতভাগে উন্নীত হয়েছে।
বিপিপিএ প্রধান বলেন, এসব পরিবর্তনের ফলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
You cannot copy content of this page