1. info@www.media71bd.com : NEWS TV : NEWS TV
  2. info@www.media71bd.com : TV :
রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ন

অনলাইন ক্লাস: জ্বালানি সাশ্রয় নাকি অপচয়ের নতুন পথ?

এম আর রোমেল, বিশেষ প্রতিনিধি
  • Update Time : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনরায় শুরু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম শ্রুতিতে যুক্তিটি যতই বাস্তবসম্মত মনে হোক না কেন, আমরা যদি সামান্য গভীরে প্রবেশ করি, তাহলে দেখতে পাব এই ‘সাশ্রয়’ আসলে এক প্রকার বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়। বরং বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, মাঠ পর্যায়ে এই উদ্যোগ জ্বালানি সাশ্রয়ের চেয়ে অপচয় ডেকে আনছে।

কথা হচ্ছে, কেন এমনটি হচ্ছে? উত্তরটি অত্যন্ত সহজ। কর্তৃপক্ষ হয়তো ধারণা করছেন, একটি নির্দিষ্ট ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করে দিলেই সাশ্রয় নিশ্চিত। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, বিদ্যুৎ তো কেবল ভবনেই খরচ হয় না; এটি খরচ হয় মানুষের ঘরে ঘরে।

একটি যুক্তিসংগত উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক, একটি স্কুলে ৫০ জন শিক্ষার্থী একটি কক্ষে বসে শারীরিক ক্লাস করছে। সেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় ৩-৪টি লাইট এবং ২-৪টি ফ্যান চলছে। যদি এটি একটি এসি কক্ষ হয়, তবে সর্বোচ্চ ২-৩টি এসি চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ, ৫০ জন শিক্ষার্থীর ক্লাস নিতে মোট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে মাত্র কয়েকটি যন্ত্রের।

এবার একই ৫০ জন শিক্ষার্থী বাড়িতে বসে অনলাইনে ক্লাস করছে। এখন প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজ ঘরে অন্তত একটি করে লাইট ও একটি করে ফ্যান চলবে। অর্থাৎ ৫০টি লাইট ও ৫০টি ফ্যান। শিক্ষার্থীরা যদি সংব্যসনশীল পরিবারের হয়, তবে ১০-১৫টি এসি কিংবা হিটারও চালাতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রতিটি বাড়িতে রাউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল চার্জার এবং ওয়াইফাই ডিভাইসের বিদ্যুৎ খরচ। সেই সঙ্গে শিক্ষকের বাড়ির বিদ্যুৎ খরচও তো রয়েছেই।

এই সরল পাটিগণিত বলছে, শারীরিক ক্লাসে যেখানে মাত্র কয়েকটি লাইট ও ফ্যানের প্রয়োজন, সেখানে অনলাইন ক্লাসে প্রয়োজন হচ্ছে কয়েক ডজন যন্ত্রপাতির। তাহলে সাশ্রয় কোথায়? বাস্তবে তো সাশ্রয় না হয়ে উল্টো ব্যয় আরোপ করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। এটি একটি বিপরীতমুখী চিন্তা, যা পরিবেশ ও অর্থনীতির দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

আমরা প্রায়শই শুনি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ বুলি, কিন্তু এই ‘ডিজিটাল শিক্ষা’ যে ভূমিতে দাঁড়িয়ে, সেই ভূমির জ্বালানি সক্ষমতা আমরা কি নির্ণয় করেছি? আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে লোডশেডিং তো রয়েছেই। এমন অবস্থায় প্রতিটি বাড়িতে আলাদা করে ফ্যান-এসি চালানোর চাপ সৃষ্টি করা মানে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো নয়, বরং চাপ বহুগুণে বাড়ানো।

এছাড়া আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, সমাজের সব শিক্ষার্থী সমান স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশে বাস করে না। যাদের বাড়িতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই, যাদের মাথার ওপর টিনের চাল, সেখানে গরমে ফ্যান চালানোও দায়। তাদের জন্য অনলাইন ক্লাস যেমন কষ্টকর, তেমনি এটা জ্বালানি সাশ্রয়ের কোনো পথ নয়, বরং বৈষম্য আরও গভীর করে।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কর্তৃপক্ষ কেন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলে দেখা যায়, হয়তো ভবনের বিদ্যুৎ বিল বাঁচানোই মূল লক্ষ্য। কিন্তু একটি ভবনের বিল বাঁচাতে গিয়ে পুরো একটি সমাজের বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়। এটি ‘আমার বাড়ির সামনের অংশ পরিষ্কার রাখতে গিয়ে প্রতিবেশির বাড়িতে আবর্জনা ফেলা’-র মতো নীতি।

সমাধান কী? সমাধান হলো সুষম চিন্তা। জ্বালানি সাশ্রয়ের সত্যিকার অর্থ হলো, শারীরিক ক্লাস চালু রেখে স্কুল-কলেজগুলিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী এসি ব্যবহার বন্ধ রেখে ফ্যান ও প্রাকৃতিক বাতাসের ব্যবস্থা করা। অথবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে হাইব্রিড পদ্ধতি চালু করা, যাতে সব শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন অনলাইনে যুক্ত হতে না হয়। একান্তই যদি অনলাইন ক্লাস নিতেই হয়, তবে তা যেন দিনের প্রথম ভাগে, যখন বিদ্যুতের চাপ কম এবং প্রাকৃতিক আলোয় লাইটের প্রয়োজন হয় কম, সেসময় আয়োজন করা।

তবে সবচেয়ে বড় কথা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের উচিত বাস্তব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। হাতে-কলমে হিসাব করে দেখা দরকার, একটি শারীরিক ক্লাসের বিদ্যুৎ খরচ বনাম পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ খরচ— কোনটি সাশ্রয়ী? উত্তরের জন্য প্রখর বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় সৎ ও দায়িত্বশীল চিন্তার।

অনলাইন ক্লাস একটি যুগোপযোগী পদ্ধতি, সন্দেহ নেই। তবে জ্বালানি সাশ্রয়ের অজুহাতে এটিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে শেষমেশ দেখা যাবে, জ্বালানি সাশ্রয়ের নামে জ্বালানি অপচয়ই হচ্ছে, আর সেই বোঝা পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ঘাড়ে। তাই পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে— ‘সাশ্রয়’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি, এবং কে এই সাশ্রয়ের সুফল ভোগ করছে?

More News Of This Category

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নহে

ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট
error: Content is protected !!