যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে—এমন তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন কোনো সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে কার্লসন বলেন, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারে মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, ইরান সেখানে আবারও পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে।
কার্লসনের বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। ডানপন্থী এই ভাষ্যকার চলতি বছর বিভিন্ন ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নানা তথ্য ফাঁস করে লেখা ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ বইয়ের লেখক মাইকেল উলফ অতীতে কার্লসনকে তাঁর ‘প্রধান গোপন তথ্যসূত্র’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এদিকে ট্রাম্প নিজেও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের আরও এক বা দুটি স্থাপনায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনও রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে এবং চাইলে খুব দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত সপ্তাহে ডানপন্থী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র বা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে পাহাড়ের গভীরে থাকা সুড়ঙ্গ ও স্থাপনা অকার্যকর করা সম্ভব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট। বিস্ফোরণের তীব্র তাপ, চাপ ও অগ্নিকাণ্ডে তাৎক্ষণিকভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা মানুষও বিকিরণজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিতে পড়বেন। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পরও বহু মানুষ দীর্ঘদিন বিকিরণের কারণে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এ ধরনের বিস্ফোরণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা ‘ফলআউট’ নামে পরিচিত। বিস্ফোরণের ধরন, অবস্থান ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ দূরবর্তী অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বৃষ্টির সঙ্গে তা ভূপৃষ্ঠে নেমে এসে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইরানে এমন হামলা হলে তেজস্ক্রিয় দূষণ শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ধরনের হামলা সরাসরি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করবে, এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে সংঘাতের বিস্তার ঘটলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রেও শুরুতে সংঘাত সীমিত অঞ্চলে থাকলেও পরবর্তী সময়ে বহু দেশ এতে জড়িয়ে পড়ে।
পারমাণবিক হামলার আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের প্রচেষ্টা বেড়ে যাওয়া। কোনো দেশ যদি দেখে যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে, তাহলে অন্য দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একই ধরনের অস্ত্র তৈরির কথা ভাবতে পারে। এতে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়বে।
এ ছাড়া এমন হামলার প্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসবাদ ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও দেশটির মিত্ররাও নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়বেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে, মার্কিন জনগণ যুদ্ধের বিরোধী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বিবেকের তাড়নায় হোক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে—মার্কিনিরা যুদ্ধকে না বলেছেন। আমরাও এই বার্তাকে সমর্থন করি।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় জনগণের মতামত উপেক্ষা করে, তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
গত বছরের জুনে ইরানে হামলা চালালে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ হবে এবং ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটবে—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এমন ধারণা দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং দেশটির সরকারও ক্ষমতায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশটির প্রেসিডেন্টের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও বাধার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও দুর্বল করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একাধিকবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতি অন্য দেশগুলোকেও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে উৎসাহিত করতে পারে।
বিশ্বে একসময় ধারণা ছিল, প্রতিটি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে পারস্পরিক ধ্বংসের আশঙ্কায় বড় যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নেতৃত্ব সব সময় যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার বিশ্বশান্তির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
পারমাণবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝাতে চেরনোবিল দুর্ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। ওই দুর্ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনার প্রভাব এক নয়; অস্ত্রের বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞ আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার হুমকি ইরানকে চাপে রাখার কৌশলও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ইউক্রেনকে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েও রাশিয়া প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা কমাতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। সম্প্রতি সংস্থাটির সঙ্গে ইরানের আলোচনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নতুন পদ্ধতি নিয়ে কথা হয়েছে।
ইরান চাইলে আইএইএকে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাতে পারে। এতে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে পরিদর্শনে বাধা দেওয়া হলে ওই স্থাপনায় কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান এবং ইসরায়েলের চাপ—এই তিন বিষয়কে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
You cannot copy content of this page