পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগস্টের শেষ দিকে একটি শিশু হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু দেশটির স্বাস্থ্যসেবা ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়লেও সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশটির নানা সীমাবদ্ধতা এ ঘটনায় সামনে এসেছে।
জাপানের অনলাইন সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে পাকিস্তানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক ফারহান বোখারি বলেন, রাজধানীর ওই হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড অভিজাত ও সাধারণ পাকিস্তানিদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যকে স্পষ্ট করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট হাসপাতালের একটি নার্সারি ওয়ার্ডে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে এয়ার কন্ডিশনারের ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা যায়। ওই সময় ইনকিউবেটরে ১৫ জন নবজাতক ছিল; তাদের মধ্যে মাত্র একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
নিরাপত্তাকর্মীর অনুপস্থিতিতে নার্সারির দরজা তালাবদ্ধ থাকার অভিযোগও ওঠে। উদ্ধারকর্মীরা শিশুদের বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ নবজাতককে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর শিশুদের অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
ঘটনার পর পাকিস্তান সরকার রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে দেশজুড়ে হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে বিশ্লেষক বোখারির মতে, এ ধরনের ঘটনা পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত জনসেবা খাতের বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির আর্থিক সম্পদের বড় অংশ ঋণ পরিশোধ, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হলেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে পাকিস্তান ১৯৩ দেশের মধ্যে ১৬৮তম অবস্থানে রয়েছে এবং ‘নিম্ন মানব উন্নয়ন’ শ্রেণিতে আছে। দেশটির মানব উন্নয়ন সূচকের মান ০.৫৪৪।
অন্যদিকে পাকিস্তানের ঋণ ও রাজস্ব পরিস্থিতিও সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে পাকিস্তানের মোট সরকারি ও সরকারি-গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ জিডিপির প্রায় ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশের সমান ছিল। একই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
পাকিস্তানের করব্যবস্থা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে কর আদায় বাড়ানো এবং নতুন করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়, ঋণের চাপ এবং সীমিত রাজস্বের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভারত-পাকিস্তান নিরাপত্তা উত্তেজনা এবং আফগানিস্তান সীমান্তের অস্থিরতাও দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ফারহান বোখারির মতে, দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাকিস্তানকে জনসেবা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য করের আওতা সম্প্রসারণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তার বিশ্লেষণে দুর্নীতিকেও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইএমএফের দুর্নীতি-সংক্রান্ত মূল্যায়নে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে দুর্নীতির সম্ভাব্য ব্যাপক প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা খাতে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসলামাবাদের হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, বরং পাকিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা, অগ্নিনিরাপত্তা, রাজস্ব সক্ষমতা ও জনসেবা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ না নিলে একই ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও বড় মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা উঠে এসেছে বিশ্লেষণে।
You cannot copy content of this page