মক্কায় পবিত্র কাবা শরিফের সান্নিধ্যে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মুমিনের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। মসজিদুল হারামের পাশাপাশি পবিত্র এই নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক মসজিদ। এসব স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।
মক্কার এমন কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদের পরিচিতি তুলে ধরা হলো—
জান্নাতুল মুআল্লার দিকে যাওয়ার পথে আল-হুজুন এলাকায় মসজিদ আর-রায়াহ অবস্থিত। মসজিদুল হারাম থেকে এটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আল-মসজিদ আল-হারাম সড়কের পাশে।
‘আর-রায়াহ’ শব্দের অর্থ পতাকা। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল-হুজুনের এই এলাকায় একটি পতাকা স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে কেন্দ্র করে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক হজ ও ওমরাহ যাত্রীর কাছে মসজিদটি ‘ক্যাট মসজিদ’ নামেও পরিচিত। তবে এ নামের ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না।
আর-রায়াহ মসজিদ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত মসজিদ আল-জিন। এটি ‘আল-হারাস মসজিদ’ নামেও পরিচিত। তবে ‘আল-জিন মসজিদ’ নামটিই বেশি প্রচলিত।
বর্ণনা অনুযায়ী, আল-হুজুন এলাকায় জিনদের একটি দলের কাছে মহানবী (সা.)-এর দাওয়াত পৌঁছানোর ঘটনার স্মৃতির সঙ্গে মসজিদটির নাম জড়িয়ে আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে এই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
মসজিদের নামের সঙ্গে ‘জিন’ শব্দটি থাকলেও এটি নিয়ে কোনো ভৌতিক বা অলৌকিক অভিজ্ঞতার প্রত্যাশা করার কারণ নেই। এটি মূলত ইসলামের ইতিহাসের একটি স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত।
মসজিদ আল-জিনের বিপরীতে অবস্থিত আশ-শাজারাহ মসজিদ। মহানবী (সা.)-এর একটি মু‘জিজার স্মৃতির সঙ্গে এই মসজিদের নাম যুক্ত বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।
বর্ণনা অনুযায়ী, আল-হুজুন এলাকায় ইসলাম প্রচারের সময় মহানবী (সা.)-কে অমুসলিমরা প্রত্যাখ্যান করলে তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর শক্তির একটি নিদর্শন দেখানোর জন্য দোয়া করেন। এরপর তাঁকে একটি গাছকে তাঁর দিকে আসার নির্দেশ দিতে বলা হয়। আল্লাহর ইচ্ছায় গাছটি তাঁর কাছে এসে তাঁকে সালাম জানায় এবং পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে আগের জায়গায় ফিরে যায় বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
আগে এখানে একটি ছোট স্মারক গম্বুজ ছিল। বর্তমানে সেই স্থানে একটি মসজিদ রয়েছে।
মক্কার ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে হুদাইবিয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ‘বায়াত আর-রিদওয়ান মসজিদ’ নামেও পরিচিত। মসজিদটি শুমাইসি এলাকায়, মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
হিজরি ষষ্ঠ বর্ষে মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে মক্কার পথে রওনা হন। কিন্তু মক্কার কাছে কুরাইশরা তাদের প্রবেশে বাধা দেয়।
পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য মহানবী (সা.) হজরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনার জন্য মক্কায় পাঠান। আলোচনায় সময় গড়াতে থাকলে ওসমান (রা.)-এর নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাহাবিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
তখন সাহাবিরা মহানবী (সা.)-এর হাতে হাত রেখে আনুগত্যের শপথ নেন। ইসলামের ইতিহাসে এই শপথ ‘বায়াত আর-রিদওয়ান’ নামে পরিচিত।
বর্ণনা অনুযায়ী, এই বায়াত একটি গাছের নিচে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে সেই গাছটি কেটে ফেলা হয়। ঐতিহাসিক সেই ঘটনার স্মৃতি বহন করে বর্তমানে সেখানে মসজিদ রয়েছে।
সাইয়্যিদা আয়েশা মসজিদ মক্কার অন্যতম পরিচিত মিকাতস্থল। এটি ‘মসজিদ তানঈম’ নামেও পরিচিত। মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার উত্তরে তানঈম এলাকায় এর অবস্থান।
মক্কার বাইরে থেকে এসে যারা ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম বাঁধতে চান, তাদের জন্য তানঈম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বিশেষ করে মদিনা থেকে মক্কায় আসা অনেক হজ ও ওমরাহযাত্রী এই এলাকার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করেন।
মসজিদটি হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কারণেও পরিচিত। এ কারণে এটি ‘সাইয়্যিদা আয়েশা মসজিদ’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে।
মক্কার বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ ও স্থান রয়েছে। এসব স্থানের কিছু ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও সবগুলোর ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রামাণিকতা সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই এসব স্থান সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সূত্রের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
You cannot copy content of this page