যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে জনবল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। বন্দরের অনুমোদিত বিভিন্ন পদের মধ্যে ৭৯টি পদ শূন্য থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর ফলে পণ্য ওঠানো-নামানো, গুদাম ও ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কাজে ধীরগতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে কর্মকর্তা পর্যায়ে। বেনাপোল স্থলবন্দরের চারটি উপপরিচালক পদের মধ্যে তিনটিই বর্তমানে শূন্য। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের ৭৫ শতাংশই খালি। মাত্র একজন উপপরিচালককে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকায় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান দফতরে উপপরিচালকের চারটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন সাতজন। অর্থাৎ সেখানে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে তিনজন বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। বেনাপোলে জনবল সংকট এবং প্রধান দফতরে একই পদে অতিরিক্ত কর্মকর্তার এই চিত্র জনবল ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুদাম ও ইয়ার্ড পরিচালনাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে অনুমোদিত ২১৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪১ জন। ফলে ৭৫টি পদ শূন্য রয়েছে। অনুমোদিত পদের হিসাবে এ ঘাটতি প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। কর্মকর্তা পর্যায়ের শূন্যপদসহ বন্দরজুড়ে মোট শূন্যপদের সংখ্যা ৭৯টি।
এদিকে, বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালকের পদটিও গত ৩ আগস্ট থেকে শূন্য রয়েছে। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই স্থলবন্দরের প্রশাসনিক প্রধানের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক লতা বলেন, জনবল সংকট সমাধানে নতুন নিয়োগের পাশাপাশি বর্তমান জনবল কাঠামোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বেনাপোলে দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকা পদগুলো দ্রুত পূরণের পাশাপাশি ঢাকায় অনুমোদিত পদের অতিরিক্ত থাকা কর্মকর্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে নতুন নিয়োগের আগেই সংকটের একটি অংশ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মানজারুল মান্নান বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দরে বর্তমানে জনবল সংকট রয়েছে। এ সংকট নিরসনে দ্রুত জনবল নিয়োগের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বেনাপোল আমদানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি আমিনুল হক আনু বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় আমদানিকৃত পণ্য যথাসময়ে লোড-আনলোড করা যাচ্ছে না। ফলে এক দিনের কাজ কখনো দুদিনে শেষ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বেনাপোল বন্দরের সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় একটি অংশ যুক্ত। তাই বন্দরের কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হলে এর প্রভাব দেশের বিভিন্ন বাজারেও পড়বে।
জনবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্য ওঠানো-নামানো, গুদাম ও ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায়। আমদানিকৃত পণ্য দ্রুত খালাস করতে প্রতিটি পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু অনুমোদিত ২১৬টি পদের বিপরীতে ১৪১ জন কর্মরত থাকায় অনেককে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য ব্যবস্থাপনায়ও সময় বেশি লাগছে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, পণ্য খালাসে এক দিন অতিরিক্ত সময় লাগলে শুধু আমদানিকারকের সময়ই নষ্ট হয় না; পরিবহন ও পণ্য সংরক্ষণের ব্যয়ও বেড়ে যায়। একই অবকাঠামো দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে কম পণ্য পরিচালনা করা সম্ভব হওয়ায় বন্দরের সার্বিক কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
তবে জনবল সংকটের কারণে সরকার ঠিক কত টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে সরাসরি রাজস্ব ক্ষতির অঙ্ক নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে পণ্য ব্যবস্থাপনায় ধীরগতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রাজস্ব আদায়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনা নয়, জনবল সংকটের কারণে বন্দরের তদারকি কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে। শেড, গুদাম ও ইয়ার্ডে পণ্য ব্যবস্থাপনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন। একজন কর্মকর্তাকে একাধিক স্থান ও দায়িত্ব দেখতে হলে তদারকির পরিধি কমে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেনাপোল স্থলবন্দরের কার্যক্রমের গতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত শূন্যপদ পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন দফতরে জনবল বণ্টনের ভারসাম্য পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
You cannot copy content of this page