মুমিনের জীবনে হালাল উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলমানের ইবাদত ও জীবনযাপনের সঙ্গে হালাল রিজিকের সম্পর্ক গভীর। হালাল অর্জন এবং হারাম বর্জনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন সফলতার অন্যতম পথ।
ইসলামের দৃষ্টিতে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো ইবাদত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হালাল পন্থায় জীবিকা নির্বাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই একজন মুসলমানের ব্যবসা-বাণিজ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয়, আয়-ব্যয়, কর্মক্ষেত্র, বাসস্থান ও জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালালকে গ্রহণ এবং হারাম ও সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত।
হালালের আভিধানিক অর্থ বৈধ বা অনুমোদিত। শরিয়তের পরিভাষায়, শরিয়ত যে বিষয়কে অনুমোদন করেছে এবং যার ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই, তা হালাল।
অন্যদিকে শরিয়তপ্রণেতা আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুল (সা.) যে বিষয়কে অকাট্যভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, তা হারাম।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা স্বীয় কিতাবে যেসব জিনিস হালাল করেছেন, তা হালাল এবং আল্লাহতায়ালা তাঁর কিতাবে যেসব জিনিস হারাম করেছেন, তা হারাম। আর যেসব বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন, তা তিনি ক্ষমা করেছেন।’ (তিরমিজি : ১৭২৬)
কোনো বস্তু হালাল হওয়ার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বস্তুটি নিজেই হালাল ও পবিত্র হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেটি অর্জনের পথ বা মাধ্যমও বৈধ হতে হবে। এই দুটির যেকোনো একটিতে ব্যত্যয় ঘটলে তা হারামের আওতায় পড়ে।
অনেক মুসলমান খাবার বা ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম যাচাই করলেও সেটি কেনার অর্থ বৈধভাবে উপার্জিত কি না, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন না। যেমন গরুর গোশত হালাল এবং শূকরের গোশত হারাম—এটি জানা থাকলেও সেই গরুর গোশত কেনার অর্থটি হালাল পথে উপার্জিত কি না, সেটিও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, তা অনেকেই বিবেচনায় নেন না।
অথচ হালাল রিজিক মানুষের জীবনে প্রশান্তি ও কল্যাণের অন্যতম উৎস। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘চারটি জিনিস যখন তোমার মধ্যে পাওয়া যাবে, তখন দুনিয়ার অন্য সবকিছু না হলেও কিছু যায় আসে না। তা হলো, আমানতের সংরক্ষণ, সত্য কথা বলা, সুন্দর চরিত্র, হালাল উপার্জনে খাদ্যগ্রহণ।’ (মুসনাদে আহমদ : ৬৬৫২)
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলমান জীবনের যে অবস্থার সম্মুখীন হন, সেই অবস্থার প্রয়োজনীয় শরিয়তি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা তার দায়িত্ব। শরিয়তের পরিভাষায় এটিকে ‘ইলমুল হাল’ বলা হয়।
কারও ওপর নামাজ ফরজ হলে নামাজের মৌলিক মাসআলা জানা যেমন জরুরি, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য করলে ব্যবসার বিধিবিধান, চাকরি করলে কর্মক্ষেত্রের শরিয়তি নির্দেশনা এবং বিয়ে করলে সংশ্লিষ্ট বিধান সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
অর্থাৎ একজন মুসলমানের জন্য হালাল-হারামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্ঞান না থাকলে অজান্তেই হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সব উপকরণই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। আর রিজিকের সঙ্গে হালাল-হারামের বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কিত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা : ১৬৮)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হালাল খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সাহল বিন আবদুল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘তিনটি বস্তু মুক্তির উপায়—হালাল খাবার গ্রহণ করা, ফরজসমূহ আদায় করা এবং নবী করিম (সা.)-এর অনুসরণ করা।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ২/২০৮)
হাদিসে রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘হালাল জীবিকা সন্ধান করা নির্ধারিত ফরজসমূহের পরে বিশেষ একটি ফরজ।’ (সুনানে বায়হাকি : ৬/১২৮)
ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাদ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোনো ব্যক্তি নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও দান-সদকায় যতই যত্নশীল হোন, তার উপার্জন যদি হারাম হয়, তাহলে তা তার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মুসলিম শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন। এরপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা বলেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে, তার চুল এলোমেলো ও শরীর ধূলিমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ বলে দোয়া করছে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দিয়েই লালিত-পালিত হয়েছে। রাসুল (সা.) প্রশ্ন করেন, এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (মুসলিম : ১০১৫)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের খাদ্য, পানীয়, পোশাক ও জীবনযাপনের উপকরণ হালাল হওয়া দোয়া ও ইবাদতের কবুলিয়তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের শরীর ও মনের ওপর তার খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব পড়ে। হালাল ও পবিত্র খাদ্য মানুষের আত্মিক ও নৈতিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমে অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি হয় এবং ইবাদতের প্রতি একাগ্রতা বাড়ে।
হালাল উপার্জন থেকে অর্জিত খাদ্য ও জীবনযাপনের উপকরণ মানুষের মধ্যে নেক আমলের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল আমলের প্রতিও উৎসাহ তৈরি হয়।
অন্যদিকে হারাম উপার্জন মানুষের নৈতিক ও আত্মিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একজন মুসলমানের জন্য শুধু বেশি উপার্জন নয়, বরং সৎ ও হালাল উপায়ে উপার্জন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হালাল উপার্জনের প্রভাব শুধু ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবার ও সমাজেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষ যখন বৈধ পথে উপার্জন ও লেনদেন করতে অভ্যস্ত হয়, তখন সমাজে সততা, আমানতদারি ও ন্যায়বোধ শক্তিশালী হয়।
ফলে দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা, ভেজাল, ওজনে কম দেওয়া, কালোবাজারি, চুরি-ডাকাতি, সুদ ও অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ড কমার সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে হারাম উপার্জন ও অবৈধ কর্মকাণ্ড যখন সমাজে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন নৈতিক অবক্ষয় বাড়তে থাকে এবং সামাজিক অশান্তি তৈরি হয়।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু আহার কর এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, তা সম্পর্কে আমি অবগত আছি।’ (সুরা মোমিনুন : ৫১)
এই আয়াতে পবিত্র খাবার গ্রহণের সঙ্গে সৎকর্মের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। হালাল ও পবিত্র আহার মানুষের শরীর ও মনকে শুদ্ধ রাখার পাশাপাশি ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক।
মুমিনের জীবনে হালাল উপার্জন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি ঈমান, আমল ও নৈতিকতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে চাকরি, খাদ্য-পানীয় থেকে পোশাক, আয় থেকে ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই একজন মুসলমানের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ পথ অনুসরণ করা।
হালাল রিজিক হয়তো সবসময় বেশি সম্পদের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু এতে থাকে বরকত, প্রশান্তি ও কল্যাণ। তাই দুনিয়ার সাময়িক লাভের জন্য হারামকে বেছে না নিয়ে হালাল উপার্জনের পথেই অটল থাকা মুমিনের দায়িত্ব।
You cannot copy content of this page