সামাজিক রীতিনীতি কেমন হবে এবং মানুষ একে অপরকে কীভাবে অভিবাদন জানাবে—ইসলাম তারও সুন্দর শিক্ষা দিয়েছে। মুসলমানদের পারস্পরিক অভিবাদনের অন্যতম পদ্ধতি হলো ‘আসসালামু আলাইকুম’, যার অর্থ—‘আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।’
ইসলামের এই চমৎকার অভিবাদন পদ্ধতি মানুষের মধ্যে মনোমালিন্য দূর করে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে। শত্রুতা দূর করে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার পরিবেশ সৃষ্টি করে। ‘সালাম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। শরিয়তের পরিভাষায়, একজন মুসলিম অপর মুসলিমের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় যে বাক্যের মাধ্যমে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শান্তি, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও দোয়া কামনা করে, সেটিই সালাম।
সালামের এই সুন্দর বিধান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রবর্তিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে তাঁকে ফেরেশতাদের একটি দলের কাছে গিয়ে সালাম দিতে বলেন এবং তাঁর সালামের জবাবে তারা কী বলে, তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে বলেন। কারণ, সেটিই হবে আদম (আ.) ও তাঁর সন্তানদের অভিবাদনের পদ্ধতি।
এরপর আদম (আ.) ফেরেশতাদের কাছে গিয়ে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ ফেরেশতারা জবাবে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ফেরেশতারা ‘ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ অংশটি বাড়িয়ে জবাব দিয়েছিলেন। (বোখারি : ৩৩২৬)
মহান আল্লাহ সালামের জবাব উত্তমভাবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, ‘তোমরা যখন বিশেষ শব্দে সালামপ্রাপ্ত হবে, তখন তোমাদের প্রতি প্রদত্ত সালামের চেয়ে উন্নত ভাষায় সালাম দেবে। অথবা ওই ভাষায়ই উত্তর দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা প্রতিটি বিষয়ের হিসাব সংরক্ষণকারী।’ (সুরা নিসা : ৮৬)
সালাম বিনয় ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেয়। সালাম প্রদানকারী অহংকার থেকে দূরে থেকে অন্যের প্রতি শান্তি ও কল্যাণের দোয়া করেন। অন্যদিকে অহংকার মানুষের মধ্যে দূরত্ব ও শত্রুতা তৈরি করতে পারে। বিনয় মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
মানুষের সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরির অন্যতম সুন্দর মাধ্যম হলো সালাম। বিনা খরচে, কোনো কষ্ট ছাড়াই দেওয়া যায় এমন এই অভিবাদন শুধু একটি বাক্য নয়; বরং এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘উত্তম ইসলাম কোনটি?’ তিনি বলেন, ‘অন্যকে খাদ্য খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।’ (বোখারি : ১২)
সালামের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে শত্রুতা, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা দূর করার পথ তৈরি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনয়ন করবে। আর তোমরা ঈমানদার হিসেবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন কথা বলে দেব না, যা করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার করবে।’ (তিরমিজি : ২৬৮৮)
তাই মুসলমানদের উচিত, সালামের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা। পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে বেশি বেশি সালাম বিনিময় করা এবং একে অপরের শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করা।
শুধু নিজেদের মধ্যে সালামের চর্চা করলেই হবে না; সন্তানদেরও ছোটবেলা থেকেই সালামের শিক্ষা দিতে হবে। তাদের সালাম দেওয়া ও সালামের জবাব দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের পাশাপাশি সমাজেও সালামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।
সালামের এই সুন্দর শিক্ষা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বাড়াতে পারে। এর চর্চার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও কল্যাণকর পরিবেশ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হতে পারে।
You cannot copy content of this page