চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি সরকার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৭৯৫ মার্কিন ডলার দরে এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে। কয়েক মাস আগে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ ডলারের কাছাকাছি দামে কেনা হয়েছিল, সেখানে বর্তমান দর প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে।
এলএনজির এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও সরবরাহ সংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এশিয়ার স্পট বাজারে দাম দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রায় ৩০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউতে উঠেছে।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ১৩ সেপ্টেম্বরের সভায় অক্টোবর মাসে সরবরাহের জন্য একাধিক এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দুটি কার্গোর জন্য সুপারিশ করা হয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্যের টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার ও সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়াকে।
অক্টোবরের ৯ থেকে ১০ তারিখে সরবরাহের জন্য ৫২তম কার্গোটি টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ারের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ৯৫ ডলারে এবং ২৭ থেকে ২৮ অক্টোবরের ৫৬তম কার্গোটি ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলারে কেনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডারাব ইনকরপোরেটেডের কাছ থেকে দুটি কার্গো প্রতি এমএমবিটিইউ ১৭ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইন্ড মিঙ্গল এলএলসির কাছ থেকে আরও দুটি কার্গো ১৯ ডলার দরে কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এলএনজির এত বেশি দামে আমদানি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশই বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, যুদ্ধের শুরুতে বিভিন্ন দেশ নিজেদের মজুত ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিলেও এখন অনেক দেশের মজুত কমে এসেছে। ফলে তারা বাজার থেকে নতুন করে জ্বালানি কিনতে শুরু করেছে। এতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তার মতে, সংকটের সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও দামের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বাংলাদেশ কাতার ও ওমানের সঙ্গে যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে, সেসব চুক্তির আওতায় আমদানি করা এলএনজির দাম বর্তমান স্পট মার্কেটের দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
কাতারএনার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ১০ দশমিক ১১৪ ডলার। আর ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তিতে এ দাম প্রায় ৯ দশমিক ৪৪৪ ডলার। ওমানের সঙ্গে চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে বাংলাদেশ ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭ কার্গো এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। চুক্তির আওতায় প্রথম দিকের ১৪টি কার্গোর মূল্য এশিয়ার জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকের সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে শূন্য দশমিক শূন্য ৮৭৫ ডলার যোগ করে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৯ থেকে পরবর্তী সরবরাহের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ হবে হেনরি হাবের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫ দশমিক ২০ ডলার যোগ করে।
বাংলাদেশে গানভরের প্রথম এলএনজি কার্গো সেপ্টেম্বরেই পৌঁছেছে। এ চুক্তির উদ্দেশ্য হিসেবে বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে জেকেএম-ভিত্তিক প্রাথমিক কার্গোগুলোর দাম আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করায় এ নিয়ে ব্যয়ের প্রশ্নও উঠেছে।
বর্তমান সংকটের মধ্যে বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানও বড়। সাম্প্রতিক হিসাবে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি থাকলেও চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে এলএনজির পাশাপাশি ভারত থেকেও ডিজেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন বা ৪৭ লাখ লিটার ডিজেল দিনাজপুরের পার্বতীপুর রিসিভিং টার্মিনালে পৌঁছায়। এটি পাইপলাইনের ৭২তম চালান।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের মধ্যে ২০১৭ সালে ১৫ বছরের ডিজেল আমদানির চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজেলের দাম ওঠানামা করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় সরকারের ওপর চাপ তৈরি করলেও গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা ও শিল্প-বিদ্যুৎ খাতের সরবরাহ সচল রাখতে আমদানি অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফলে সামনে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—দুই বিষয়ই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
You cannot copy content of this page