যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় বিজয় দেশটির রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদেও জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। জনমত জরিপের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরকে রাজনৈতিকভাবে কঠিন করে তুলতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিজয় কেবল বিরোধী দলের আসনসংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা নয়; বরং ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষেরও প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অস্থির শুল্কনীতি, স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় সংকোচন এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৯ জন জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা ভোটারদের এই অসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ট্রাম্প-সমর্থিত কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো।
সাউথ ক্যারোলাইনায় চলতি শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। কানসাসে ১৯৩২ সালের পর প্রথমবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন এবং ওহাইওতে শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজিত করে আসন জিতেছেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো ও তরুণ ভোটারদের একটি অংশ এবার তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, লাতিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন ৪৬ শতাংশ থেকে কমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
অর্থনীতি ও অভিবাসন নীতি নিয়ে অসন্তোষকে সমর্থন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নারী ও সংখ্যালঘু প্রার্থীদের সাফল্যও এবারের নির্বাচনে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্জিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ নারী কেইশা ল্যান্স বটমস এবং টেক্সাসে প্রথম লাতিনা হিসেবে জিনা হিনোজোসা গভর্নর নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ায় প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও বাজেট অনুমোদনের প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ব্যয়, নীতিনির্ধারণ ও করপোরেট সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত ও শুনানি আয়োজনের সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাটরা।
তবে বড় জয় সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতার কারণে কংগ্রেসে কোনো বিল পাস হলেও তা আটকে দিতে পারবেন ট্রাম্প। সেই ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া দলের মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল অংশের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা এবং ভোটারদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা দেওয়াও ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে। ক্ষমতা পাওয়ার পরও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ব্যর্থ হলে এই বিজয়ের রাজনৈতিক সুফল দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব ও ক্ষমতার সমীকরণ গড়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
You cannot copy content of this page